ডিসেম্বরেও ঝুলছে থার্ড টার্মিনাল!

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল চলতি বছরের ডিসেম্বরেই চালু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে চালুর সম্ভাব্য সময়সীমা ১৬ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি সেই লক্ষ্যমাত্রাকে সংশয়ের মুখে ফেলেছে। টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে এখনো চুক্তিই হয়নি। কবে নাগাদ হবে নিশ্চিতভাবে তাও বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। টার্মিনালের অবশিষ্ট কাজ ও ঠিকাদারের বকেয়া পরিশোধে আরও ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছেন বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই সফট ওপেনিং করার বিষয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

অন্যদিকে, শাহজালালকে নিয়ে সংশয় থাকলেও দেশের অ্যাভিয়েশন খাতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সমুদ্রতীরবর্তী এই আধুনিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী সপ্তাহে বেবিচক কর্মকর্তাদের কক্সবাজারের বিমানবন্দর সরেজমিন দেখার কথা রয়েছে।

বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালকে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে যাত্রী সেবার জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়নে দুটি বড় বাধা এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।

টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে জাপানের একটি কনসোর্টিয়ামকে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় এই চুক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে জাপানি কনসোর্টিয়ামের চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। চুক্তির শর্ত, লাভ-ক্ষতির অংশীদারত্ব এবং বিমানবন্দর পরিচালনার কারিগরি দিক নিয়ে দর কষাকষি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। চুক্তি হওয়ার পর জাপানি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল নিয়োগ, সিস্টেম সেটআপ এবং ট্রায়াল রান দিতেই কয়েক মাস সময় লেগে যাওয়ার কথা। চুক্তি না হওয়ায় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি এখন থমকে আছে। এদিকে টার্মিনালের অবকাঠামোগত মূল কাজ বড় অংশে শেষ হলেও সামগ্রিক প্রকল্পের গড়ে ১০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ, সফটওয়্যার ও ডেটা ইন্টিগ্রেশন, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম স্থাপন এবং গ্র্যাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ এখনো শেষ হয়নি।

বেবিচক সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে আংশিক (সফট) উদ্বোধনের পর আশা করা হয়েছিল যে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ যাত্রী সেবা শুরু হবে। তবে পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তির অমীমাংসিত অবস্থা, অবকাঠামোগত অসম্পূর্ণতা এবং বাড়তি ব্যয় পর্যালোচনার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। এবারও যদি সফট ওপেনিং হয় তাহলে আরও পেছাবে ফ্লাইট চলাচল। তবে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি আগামী ১৬ ডিসেম্বর পুরোপুরি ফ্লাইট চালু করতে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে, সবচেয়ে বড় বাধা জাপান। তাদের হাতে পরিচালনার বেশির ভাগ অংশ চলে গেলেই বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারপরও চেষ্টা চলছে দ্রুত সময়ে টার্মিনাল চালু করতে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যদি সব কাজ শেষও হয়, তাহলেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ছাড়পত্র এবং মহড়া (ড্রাই রান) শেষ না করে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে। জাপানের সঙ্গে গ্র্যাউন্ড হ্যান্ডেলিং, টার্মিনাল সার্ভিস ফি, রাজস্ব বণ্টন ও নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে দুপক্ষ এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

আরও ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দ চান মন্ত্রী : থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালু করতে অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে সংসদে জানিয়েছেন বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, টার্মিনালের কাজ চূড়ান্তভাবে শেষ করা, ঠিকাদারের কিছু বকেয়া এবং অন্য সংস্থার পাওনা পরিশোধ করে অবকাঠামো চালু করতে ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই এ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। জানা যায়, থার্ড টার্মিনাল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বাজেট ও নকশাগত কিছু পরিবর্তন আনায় এর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পুনর্মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপির আওতায় রক্ষণাবেক্ষণ, পরামর্শক ফি এবং বিভিন্ন ধরনের ‘ভেরিয়েশন ওয়ার্ক’-এর জন্য অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকার খরচের বিষয়টি পর্যালোচনার মধ্যে এসেছে। এই আর্থিক ও প্রশাসনিক অনুমোদন সংক্রান্ত জটিলতাও কাজের গতি কিছুটা শ্লথ করেছে।

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (্আইকাও) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, কোনো নতুন টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গ চালুর আগে নিরাপত্তা মহড়া এবং সার্বিক গ্রাউন্ড অপারেশনের ফিটনেস সার্টিফাইড হতে হয়। থার্ড টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর আগে এই ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। বিমানবন্দরের বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ প্রসারের জন্য এ প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল হস্তান্তরের পর ডেডিকেটেড টেকনিক্যাল অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বজায় রাখা অপরিহার্য। অত্যাধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডেলিং সিস্টেম, বোর্ডিং ব্রিজেস, মেকানিক্যাল সার্ভিস এবং আধুনিক আইটি নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য দক্ষ জনবল ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চুক্তি প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য এই রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বড় আকারের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও ডিফেক্ট লাইয়াবিলিটি পিরিয়ড এবং সিস্টেম টিউনিং পিরিয়ডে কারিগরি তদারকি হচ্ছে। প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান বলেন, ‘মূল্যায়ন কমিটির সভা শেষ হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হবে, তারপর চুক্তি হবে। আমরা ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে যে সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, তার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, সবকিছু সময়ের মধ্যেই শেষ করতে পারব।’

নির্মাণকাজ শেষ হলেই টার্মিনাল চালু করা যায় না : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নির্মাণকাজ শেষ হলেই একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল চালু করা যায় না। যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, চেক-ইন, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, বোর্ডিং, ভূমি পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রতিটি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রস্তুত করতে হয়। বিশেষ করে থার্ড টার্মিনালের মতো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থাপনায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। টার্মিনাল ভবিষ্যতে বিমানবন্দরের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আয়ের উৎস হবে। এই প্রসঙ্গে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) ও মূল্যায়ন কমিটির সহসভাপতি এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, ‘জাপানি প্রতিষ্ঠান থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছি। সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব।

অক্টোবরে কক্সবাজার বিমানবন্দর উদ্বোধন : শাহজালাল টার্মিনাল নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা, তখন দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এই বিমানবন্দরটি দেশের পর্যটন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিমানবন্দরটির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের বিশেষ আকর্ষণ : কক্সবাজার বিমানবন্দরের মূল আকর্ষণ হলো এর রানওয়ে। দেশের দীর্ঘতম (১০,৫৬১ ফুট) এই রানওয়ের একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের জলরাশি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি দেশের প্রথম এবং বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ‘মেরিন রানওয়ে’। আগে কক্সবাজার বিমানবন্দরে কেবল ছোট বা মাঝারি আকারের উড়োজাহাজ নামতে পারত। নতুন রানওয়ে ও আধুনিক লাইটিং সিস্টেম চালু হওয়ায় বোয়িং ৭৭৭ বা এয়ারবাস এ৩৩০-এর মতো সুবিশাল দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সরাসরি কক্সবাজারে অবতরণ করতে পারবে। ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকরা ঢাকায় না এসে সরাসরি কক্সবাজারে অবতরণ করতে পারবেন। এর ফলে দেশের পর্যটন শিল্প নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাবে।

টার্মিনাল ভবনের কাজ প্রায় শেষ : বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কক্সবাজারে যখন বিমান অবতরণ বা উড্ডয়ন করবে তখন বিমানের দুপাশেই থাকবে সাগরের জলরাশি। সমুদ্রে যতটুকু রানওয়ে আছে সেখানে পানিতে ব্লক, জিওটিউবসহ অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। বিমাবন্দরে নতুন টার্মিনাল ভবনের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বসানো হচ্ছে গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম, সেন্ট্রাল লাইন লাইট, সমুদ্রের ভেতর ৯০০ মিটার পর্যন্ত প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং, ইন্সট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম, নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ ও বাঁশখালী নদীর ওপর সংযোগ সেতু। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রূপ পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনার পর ফ্লাইট ওঠানামা করবে কক্সবাজারে।