যেখানে অমর হয়ে শুয়ে আছেন বীরাঙ্গনা সখিনা

যুগে যুগে ভালোবাসা জন্ম দিয়েছে নানা ঘটনা, নানা কিংবদন্তীর। তেমনি এক ঐতিহাসিক প্রেমের ঘটনা ঘটেছিল ময়মনসিংহের গৌরীপুর সম্রাট জাহাঙ্গীর এর শাসনামলে। গৌরীপুরের সখিনা ও ফিরোজ খাঁ এর প্রেমকাহিনী এখনও মানুষের মনে গেঁথে আছে। প্রেমের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে ফিরোজ নয়, নিহত হন সখিনা।

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের কুমড়ী গ্রামে রয়েছে বীরাঙ্গনা সখিনা বিবির সমাধি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এসে ঐতিহাসিক এই সমাধিস্থল দেখতে ভিড় করেন। কিন্তু যোগাযোগ, আবাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় তাদের সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরতে হয়। ফলে অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে সখিনা বিবির সমাধি ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গৌরীপুরের মাওহা ইউনিয়নের কেল্লাতাজপুর গ্রামটি মুঘল শাসনামলের স্মৃতিবিজড়িত। সপ্তদশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলের মুঘল শাসনকর্তা ছিলেন দেওয়ান ওমর খাঁ। তারই রূপবতী কন্যা সখিনা। অদূরে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ির বারো ভূঁইয়া ঈশা খাঁর দৌহিত্র ফিরোজ খাঁ। সখিনার রূপগুণের কথা শুনে ফিরোজ এবং অপরদিকে ফিরোজের বীরত্বের কথা শোনে সখিনা দুজন দুজনকে না দেখেই প্রেমে পড়ে যান। সখিনাকে বিয়ে করার জন্য ওমর খাঁর দরবারে প্রস্তাব পাঠান ফিরোজ।

বারো ভূঁইয়ারা মুঘলদের শত্রু হওয়ায় বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অপমানের প্রতিশোধ নিতে ফিরোজ খাঁ কেল্লাতাজপুর আক্রমণ করে সখিনাকে তুলে এনে বিয়ে করেন। প্রতিশোধ নিতে ওমর খাঁ জঙ্গলবাড়ি আক্রমণ করে ফিরোজ খাঁকে বন্দি করেন। স্বামীকে উদ্ধার করতে বাবার বিরুদ্ধে পুরুষ বেশে যুদ্ধে নামেন সখিনা। এরমধ্যে কূটকৌশল করেন ওমর খাঁ। যুদ্ধের ময়দানে খবর রটান জেলে বসে ফিরোজ খাঁ সখিনাকে তালাক দিয়েছেন। ফিরোজের মোহরযুক্ত মিথ্যা তালাকনামা দেখে সখিনার হাত থেকে পড়ে যায় তলোয়ার। ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যান তিনি।

কিল্লাতাজপুরের পার্শ্ববর্তী কুমড়ি গ্রামে তাকে সমাহিত করা হয়। তখন থেকেই প্রেম ও বীরত্বের জন্য সখিনার নামের পাশে উপাধি হয় বীরাঙ্গনা। ধীরে ধীরে এ সমাধি হয়ে উঠে প্রেমিক-প্রেমিকাদের তীর্থস্থান। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, এক সময় সখিনা বিবির সমাধি উন্মুক্ত থাকলেও ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করে গেলে কিছু দিন পরেই সরকারি বরাদ্ধে চার দিকে সীমানা প্রাচীর ও তোরণ নির্মিত হয়। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রোপণ করা হয়েছিল বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।

এক সময় কুমড়ী গ্রামে ভূতড়ে পরিবেশ ছিল বর্তমানে এই গ্রামে রয়েছে ঐতিহাসিক বীরাঙ্গনা সখিনা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এমটিসি মডেল স্কুল, বীরাঙ্গনা সখিনা ইংলিশ লার্নিং সেন্টার, কুমড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা মিজাজ খান টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড বিএম কলেজ, বীরাঙ্গনা সখিনা সমাজ কল্যাণ সংস্থা, সহ একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে এ গ্রামে গড়ে উঠেছে শিক্ষার নগরী হিসেবে। 

মাওহা ইউপি চেয়ারম্যান আল ফারুক বলেন, পর্যটন কেন্দ্রের জন্য উপযোক্ত জায়গা বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধিস্থল। দুই বছর আগে বিগত সরকারের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী একেএম খালিদ বাবু এমপি সখিনার সমাধি পরিদর্শন করে বলেছিলে খুব শীঘ্রই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন কিন্তু আজও বাস্তবায়ন হয়নি। আমি বর্তমান সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই পর্যটন কেন্দ্র দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। 

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, সখিনা বিবির সমাধি প্রশাসনের পক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে পরবর্তীতে বরাদ্ধ আসলে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।