আমাদের স্মরণে আছে, ২০১৫ সালের ১ জুলাই কার্যকর হওয়া অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল। ওই বেতন কাঠামোতে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা হলেও ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং বাংলা নববর্ষ ভাতা চালু করা হয়েছিল। এরপর প্রতি বছর মূল বেতন ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হলেও নতুন করে কোনো জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে আগের বেতন কাঠামোর ভিত্তিতেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা নির্ধারিত হয়ে আসছে। ১ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১ আগস্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘বেতন ও চাকরি কমিশন, ২০২৬’ এবং এ সংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশের আলোকে নতুন বেতন স্কেল ও ভাতাদি নির্ধারণের প্রস্তাবের সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী ‘প্রতিবন্ধী সন্তান’ ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। এর আওতায় রয়েছেন পেনশনভোগীরাও। আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অভিনন্দিত করি।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তা ভেঙে ভেঙে দেওয়া হবে। এর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক ও গতিশীল জীবনযাত্রার প্রয়োজনে এর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। আমরা জানি, আমাদের সম্পদ সীমিত ও বিদ্যমান বৈশ্বিক অস্থিশীলতার প্রেক্ষাপটে নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সরকারকে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। ‘অভাব থেকে সৃষ্ট দুর্নীতি’ দূর করতে বর্ধিত ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে ইতিবাচক প্রত্যাশা ব্যক্ত হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরও দুর্নীতি আশানুরূপ কমেনি। আমরা মনে করি, বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে অভাব দূর করা সম্ভব, কিন্তু অসাধুদের লোভ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকলে কেবল বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি রোধ করা কঠিন। এও আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, পে-স্কেল ঘোষণার পরপরই বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেতন বৃদ্ধির সুফল অনেকাংশেই ম্লান হয়ে যায়। আমরা এও মনে করি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শুদ্ধাচার কৌশল এবং নৈতিকতার চর্চায় জোর দেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের বিশ্বাস, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক তদারকি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয় যদি কাক্সিক্ষতমাত্রায় ঘটানো না যায় তাহলে দুর্নীতি দূরীকরণের পথ সুগম করা কঠিন নয়। এও আমলে রাখা বাঞ্ছনীয়, ডিজিটাল সেবার প্রসার ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেনি। দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ। আমরা জানি, দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকার রয়েছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতির প্রমাণ পেলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে দৃষ্টান্তমূলক প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে। এ লক্ষ্যে দুদককে আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পদোন্নতি এবং সুযোগ-সুবিধা শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ণয় না করে সততা ও কর্মদক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়াও সমীচীন।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, এই প্রশ্নও ইতিমধ্যে উঠেছে। আমরা মনে করি, এজন্য প্রথমত অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ গভীর করা দরকার। ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে সম্পদের অপচয় রোধেও মনোযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অনস্বীকার্য যে, সরকার পুঞ্জীভূত সংকটের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বিদ্যমান সংকট থেকে বের হতে আমাদের বাস্তবতার আলোকে নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ছক কষে চলাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। জনজীবনে স্বস্তি আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ কলকারখানা চালু করাসহ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দূরদর্শী উদ্যোগ গতিশীল করতে হবে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার জন্য চাই সরকারের সাম্যনীতি ও কঠোর নজরদারি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের সেবক এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তারা যে বেতনভাতা পান এর মালিক জনগণ। অর্থনীতির কঠিন সময়ে ঘোষিত নবম পে-স্কেল তাদের সেবামূলক মনোভাব ও উদার নীতি-নৈতিকতার বোধ অধিকতর পুষ্ট করার তাগিদও দিয়েছে।