সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের নীতি, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। কিন্তু প্রশাসনের কোনো অংশ যদি জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারের বৈধ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনীহা দেখায়, অকারণে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের জন্য, তাহলে বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমান বাস্তবতায় প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ সরকারকে দুর্বল কিংবা ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে সক্রিয় কিনা, এমন অভিযোগ উঠছে। এর সত্যতা অবশ্যই তথ্য, নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা বাঞ্ছনীয় । কারণ গণতন্ত্রে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে কোনো সংগঠিত অপতৎপরতার সম্ভাবনা থাকলে সেটিকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। সরকারকে তাই একই সঙ্গে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, একদিকে প্রশাসনের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা রক্ষা, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও  অসহযোগিতার ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি।

সরকারের নীতি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয় প্রশাসন। মন্ত্রণালয় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হলে জনগণ শেষ পর্যন্ত দায়ী করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা, ফাইল আটকে রাখা, মাঠপর্যায়ে ভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করা হলে তার রাজনৈতিক অভিঘাত সরাসরি সরকারের ওপর পড়ে। এখানেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের সম্ভাব্য অসহযোগিতা সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধিতা সহজে চিহ্নিত করা যায়; কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালে কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা কঠিন। তাই সরকারকে অভিযোগের ওপর নয়, তথ্য ও কর্মদক্ষতার সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রশাসনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। কোন সিদ্ধান্ত কত দিনে বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে এবং বিলম্বের যুক্তিসংগত কারণ ছিল কিনা এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় আনাও জরুরি। এ পরিস্থিতিতে আমাদের দলের দায়িত্ব শুধু অভিযোগ করা নয়, বরং একটি কার্যকর বিকল্প রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরা।

প্রথমত, দলের গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি তথ্যভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থার প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা অনানুষ্ঠানিক প্রভাবের পরিবর্তে নির্ধারিত সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। তৃতীয়ত, কোনো কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসহযোগিতার অভিযোগ পাওয়া গেলে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, সরকারকে প্রশাসনিক সংস্কারের দিকে এগোতে হবে। যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বকে প্রশাসনিক মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের বৈধ দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্বে ব্যর্থ হলে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সরকার কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোথায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরলে অপপ্রচার-বিভ্রান্তির সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে।

মনে রাখা উচিত রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সংবিধান ও আইনের অধীন। কেউ যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন, জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারের বৈধ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা সৃষ্টি করেন অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তবে এর অর্থ প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নয়। অভিযোগের নামে হয়রানি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শাস্তি কিংবা আইনবহির্ভূত কোনো পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে আইনের মাধ্যমে।

সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান তা শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা মোকাবিলা করা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। প্রশাসনের ভেতরে যদি কোনো সমন্বয়হীনতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা পরিকল্পিত অসহযোগিতা থেকে থাকে, তা দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে আত্মসমালোচনার সাহসও রাখতে হবে। প্রশাসনের ব্যর্থতা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি সফল সরকার শুধু বিরোধীদের মোকাবিলা করে সফল হয় না বরং নিজের প্রশাসনকে দক্ষ, সৎ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণমুখী করে তুলেই সফল হয়। আতঙ্ক নয়, সতর্কতা; প্রতিহিংসা নয়, সতর্কতা;  গুজব নয়; তথ্য এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার পরিবর্তে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়া এই লক্ষ্যগুলো থাকুক সামনে। রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং জনগণÑ সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দক্ষতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং ন্যায়সংগত জবাবদিহি। সরকারকে ব্যর্থ করার যেকোনো বেআইনি বা ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা যেমন রুখতে হবে, তেমনি সরকারের ভুল-ত্রুটি সংশোধনের রাজনৈতিক সাহসও দেখাতে হবে।

লেখক : গবেষক, শিক্ষক ও সদস্য, কেন্দ্রীয় ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি বিএনপি। চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ গভর্নিং বডি