তমদ্দুন মজলিস ও ইসলামি সংস্কৃতি

এ দেশে ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ইতিহাসে তমদ্দুন মজলিস গুরুত্বপূর্ণ নাম। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সংগঠনটির জন্ম। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হলে মুসলিম সমাজে ইসলামি চেতনা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে জাগ্রত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। ইসলামি আদর্শকে সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর (কারও কারও মতে ২ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে এর নাম ছিল পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস। পরে নামটি পরিবর্তিত হয়ে তমদ্দুন মজলিস হয়। প্রতিষ্ঠাকালে আবুল কাশেমের সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক এ এস এম নূরুল হক ভূঁইয়া, শাহেদ আলী, আবদুল গফুর, হাসান ইকবাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী।

তমদ্দুন মজলিসের মূল উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ইসলামি চেতনার উন্মেষ ঘটানো এবং ইসলামি ভাবধারা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো। সংগঠনটির আদর্শ ছিল ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিধানকে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তি ও সমাজজীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া বিধান বাস্তবায়নের একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা হিসেবেই তারা ইসলামকে দেখত। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের জীবন পরিচালনায় তার বিধানের গুরুত্ব ছিল তাদের আদর্শগত চিন্তার অন্যতম ভিত্তি।

তবে তমদ্দুন মজলিসের সাংস্কৃতিক চিন্তা কেবল ধর্মীয় আবহে সীমাবদ্ধ ছিল না। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে কুসংস্কার, গতানুগতিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দূর করে সুস্থ ও সুন্দর তমদ্দুন গড়ে তোলার কথা বলা হয়। যুক্তিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ধর্মভিত্তিক সাম্যবাদের দিকে মানবসমাজকে এগিয়ে নেওয়া, মানবীয় মূল্যবোধভিত্তিক সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা এবং নিখুঁত চরিত্র গঠনের মাধ্যমে গণজীবনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখাও ছিল এর লক্ষ্য।

প্রতিষ্ঠার পর তমদ্দুন মজলিস ব্যাপক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। আলোচনা সভা, সেমিনার, বিতর্ক, নাট্যাভিনয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তক, পুস্তিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ ছিল সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর তমদ্দুন মজলিসের বাংলা মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক প্রকাশিত হয়। শুরুতে এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন শাহেদ আলী এবং পরে আবদুল গফুর এ দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার আজিমপুর রোডের ১৯ নম্বর বাড়ি থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো এবং ১৯৬১ সাল পর্যন্ত এটি চালু ছিল।

ইসলামি সাংস্কৃতিক চেতনা বিস্তারের পাশাপাশি তমদ্দুন মজলিস খুব দ্রুত বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন তমদ্দুন মজলিস এর বিরুদ্ধে প্রথম দিকেই প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শিরোনামে একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকা প্রকাশ করে। এই পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল কাশেম বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।

পুস্তিকাটিতে ভাষা ব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাবও দেওয়া হয়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে শিক্ষার বাহন, আদালতের ভাষা ও অফিসের ভাষা করার কথা বলা হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ও উর্দু রাখার প্রস্তাব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে প্রথম ভাষা এবং উর্দুকে দ্বিতীয় বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা হিসেবে রাখার কথাও বলা হয়। ইংরেজিকে তৃতীয় বা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রতিবাদে তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন অধ্যাপক এ এস এম নূরুল হক ভূঁইয়া এবং কোষাধ্যক্ষ হন অধ্যাপক আবুল কাশেম। ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে আবুল কাশেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্রদের সমর্থন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে প্রথম প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আবুল কাশেম এতে সভাপতিত্ব করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে তমদ্দুন মজলিসের কর্মীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের যৌথ সভায় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ গঠিত হয়। এভাবেই ভাষার দাবিকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকার বিশেষ তাৎপর্য ছিল এর বিস্তৃত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। সংগঠনটি ইসলাম ভাবাপন্ন শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে এর পথিকৃৎ ভূমিকা উদার ও মুক্তবুদ্ধির বিভিন্ন মানুষের সমর্থনও এনে দেয়। সামাজিক প্রত্যয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য অতিক্রম করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ভাষার দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে সংগঠনটি সফল হয়েছিল। ফলে ভাষা আন্দোলন ধীরে ধীরে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।

আন্দোলনের সময় তমদ্দুন মজলিসের নেতা ও কর্মীদের ওপর সরকারি নিগ্রহ নেমে আসে। অনেককে গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ করা হয়। পুলিশ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দপ্তর এবং সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার অফিসে হামলা চালিয়ে তছনছ করে। সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কেউ কেউ নিরাপত্তার জন্য মফস্বল এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

সুতরাং তমদ্দুন মজলিসের ইতিহাস ইসলামি সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ, সাহিত্য চর্চা এবং বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার