শিশু লালন-পালনে কোন পদ্ধতি আপনার জন্য

তানজীর আহম্মেদ তুষার

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও অধ্যাপক মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

একটি শিশু কেমন মানুষ হিসেবে তৈরি হবে তার অনেকখানি নির্ভর করে তাকে কোন পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হচ্ছে তার ওপর। এখনকার শিশুদের বাইরে থেকে শেখার সুযোগ খুব কম পায় আর এ কারণেই পিতা-মাতার লালন-পালন পদ্ধতি শিশুর ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। শিশুটি আত্মবিশ^াসী ও সহযোগিতার মনোভাবসম্পন্ন হবে নাকি বিদ্রোহী অথবা প্যাসিভ হবে তা লালন-পালনের ওপর নির্ভর করে। একটি শিশুকে শুধু বাবা-মা-ই লালন করেন না, পরিবারের সবাই লালন করে থাকেন। তাই পরিবারের সবাইকে শিখতে হবে শিশু  কোন পদ্ধতিতে লালন-পালন করতে হয়। জেনে নিই শিশু লালনের কী কী পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে এবং সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি।

শিশু লালন-পালন পদ্ধতি

শিশু লালন-পালনের কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। এগুলো হলো অথোরেটারিয়ান, পারমিসিভ, ওভার প্রটেক্টিভ, আনইনভলভমেন্ট এবং অথোরেটেটিভ। এগুলোর বাংলা নাম দিলে সঠিক অর্থটি আসে না তাই ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করা হলো।

অথোরেটারিয়ান বা স্বৈরাচারী

বাবা-মায়েরা কড়া শাসনের মধ্যে ছেলেমেয়ে মানুষ করতে চান। আদেশ করা মাত্রই ছেলেমেয়েরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে এমনটাই প্রত্যাশা করেন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কড়া নিয়মকানুন মানতে হবে। ‘আমি বলছি তাই মানতে হবে’ এ জাতীয় মনোভাব থাকে। ছেলেমেয়েদের কোনো ধরনের স্বাধীনতা থাকে না। এই পদ্ধতিতে পালন করা সন্তানরা অনেক সময় মনে করে যে, বাবা-মা তাকে ভালোবাসে না।  নিয়মকানুনগুলো পিতা-মাতারা বকাঝকা বা মারধরের মাধ্যমে শেখানোর চেষ্টা করেন। ছেলেমেয়েরাও তা মেনে চলে। তবে তারা নিয়মগুলো ভালো বা যুক্তিযুক্ত মনে করে না বরং বাবা-মায়ের বকা ও মার খেতে হবে এই ভয়ে তা মানে। এর ফলে শিশুরা নিজের আচরণ নিজেই কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তা শেখে না বরং তারা তুলনামূলকভাবে কম আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ হতে পারে। এছাড়া তাদের স্বনির্ভরতার দিক থেকেও ঘাটতি থাকতে পারে। ফলে অনেকে কিশোর বয়সে এসে নানা রকমের ভুল করে ফেলে। যেমন: নেশার মধ্যে জড়িয়ে যায় এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেহেতু বাবা-মায়ের ফলে তারা তাদের নেশা থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্বও বাবা-মায়ের বলে মনে করে। বড় হওয়ার পর তাদের সম্পর্কগুলোর মধ্যেও এর একটা প্রভাব পড়ে।

পারমিসিভ

এই পদ্ধতি আগের পদ্ধতির (অথোরেটারিয়ান/স্বৈরাচারী) চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে তেমন কোনো নিয়মকানুন নেই। নিয়ম থাকলেও তা খুবই এলোমেলোভাবে থাকে। শিশুর সব চাহিদা বলা মাত্রই পূরণ করা হয়। শিশুটি বিপদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা না থাকলে শিশু যা করতে চায় তাতেই পিতামাতা অনুমতি দেন। সমাজ কীভাবে তাদের প্রত্যাশা করে তার কোনো ধারণা পিতা-মাতা দেন না। এই শিশু-কিশোররা পরে হঠকারী, অসংযত, আক্রমণাত্মক আচরণ করে ও অবিবেচক হয়। কারণ তারা শিখতেই পারে না তাদের আচরণের নেতিবাচক প্রভাব কী এবং কীভাবে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ফলে তারা তাদের নিজেদের চাহিদার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এদের অনেকে অনেক সৃজনশীল হলেও তা ভালো কাজে লাগাতে পারে না।

ওভার প্রটেকটিভ

এই ধরনের পিতা-মাতা সন্তানকে পৃথিবীর সব রকম অনিষ্ট থেকে এতটাই দূরে রাখেন যে শিশুরা বাস্তবতা বুঝতে শেখে না। পিতা-মাতা তাদের কোনো কষ্ট পেতে দেন না, সুনির্দিষ্ট বন্ধু ছাড়া অন্য বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিশতে দেন না, ব্যথা পাওয়ার ভয়ে খেলতে পাঠান না, দুর্ঘটনার ভয়ে সাইকেল চালাতে দেন না, প্রেমে পড়বে তাই ছেলে/মেয়েকে বিয়েবাড়িতে যেতে দেন না দিলেও সার্বক্ষণিক তাদের সঙ্গেই থাকেন। তাদের সব কাজই বাবা-মা করে দেন। অনেকে এভাবে মানুষ করাকে ‘তোলা’ করে মানুষ করা বলেন। এক্ষেত্রে পরবর্তী জীবনে বাস্তবতা না বুঝে ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, সামাজিকতা শিখতে পারে না, কষ্ট বা মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে শেখে না, অল্পতেই কাতর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশু আত্মনির্ভরশীল হয় না ও একাকী কোনো কাজে আত্মবিশ্বাস পায় না।

আনইনভলভমেন্ট

পারমিসিভ ও ওভার প্রটেকটিভ স্টাইলের সম্পূর্ণ বিপরীত হলো আনইনভলভমেন্ট স্টাইল। এক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানের কোনো খোঁজ রাখেন না। সন্তানরা যা খুশি তাই করার সুযোগ পায়। সন্তান ভালো করলেও খোঁজ রাখেন না ও প্রশংসা করেন না। আবার ক্ষতিকর কোনো কাজ করলেও বাবা-মা জানার চেষ্টা করেন না। আর্থিক সংগতি থাকলে বাবা-মায়ের একমাত্র দায়িত্ব হয় তাদের টাকা-পয়সা যা লাগবে দেওয়া। কোনো ধরনের গাইডলাইন তারা দেন না। কোনো যতœও শিশু পায় না। শিশু হয়তো রাতে জ¦রে ভুগছে কেউ জানতেও পারেনি তার জ¦র হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে জানলেও বাবা-মায়ের সুযোগ হয়নি তাকে যতœ নেওয়ার। শিশু তখন অনুভব করে তাকে কেউ ভালোবাসে না। সে একাকিত্বে ভোগে, দুশ্চিন্তা ও হীনমন্যতায় ভুগে এমনকি বড় হয়েও তার সম্পর্কগুলোর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

প্রতিটি বাবা-মা নিজস্ব জ্ঞান, পরিস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শিশুকে লালন-পালন করেন। কোনো বাবা-মা-ই পারফেক্ট নন। তাই পারফেক্ট না হতে পারার যন্ত্রণাও পাওয়ার দরকার নেই। যেটা করতে হবে : নিজেকে মূল্যায়ন করে দেখুন আপনি কোন পদ্ধতিতে সন্তান লালন করছেন এবং কীভাবে করলে আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য ভালো হবে।