ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ইতিবাচক আপনি

সোশ্যাল মিডিয়া যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আমাদের ভাবনা, অনুভূতি ও জীবনযাপনেরও প্রতিফলন। এখানে নেতিবাচকতা যেমন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি একটি ইতিবাচক বার্তাও বদলে দিতে পারে কারও দিন, কখনো জীবন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় পজেটিভ থাকা জরুরি। নিজের মানসিক সুস্থতা, অন্যকে অনুপ্রাণিত করা এবং সুন্দর, সহমর্মী ভার্চুয়াল পরিবেশ তৈরির জন্য। সচেতন ব্যবহারই পারে সোশ্যাল মিডিয়াকে আরও মানবিক করে তুলতে। লিখেছেন নাহিন আশরাফ

রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় শুয়ে মোবাইল হাতে নিয়েছিল নীলা। কয়েক মিনিট ফেসবুক স্ক্রল করবে, তারপর ঘুম প্রতিদিনের মতোই তার পরিকল্পনা। কিন্তু একটি পোস্টে চোখ আটকে গেল। একজন তরুণী লিখেছেন, ‘আজ অফিসে আমার বস সবার সামনে আমাকে অপমান করেছেন। খুব খারাপ লাগছে।’ পোস্টটির নিচে মুহূর্তেই মন্তব্যের ঝড় উঠল।

কেউ লিখল, ‘চাকরি করতে গেলে এসব সহ্য করতেই হবে।’ আরেকজন বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই এমন কিছু করেছেন, যার জন্য বস রেগেছেন।’ কেউ আবার মন্তব্য করল, ‘এত কিছু হলে চাকরি ছেড়ে দেন। নাটক করে পোস্ট দেওয়ার কী দরকার?’ একজন অবশ্য একটু সহানুভূতি দেখিয়ে লিখল, ‘আপনার কষ্টটা বুঝতে পারছি।’

নীলা মন্তব্যগুলো পড়তে পড়তে অবাক হলো। যে মানুষটি হয়তো দিনের সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছেন, তার একটি পোস্টকে ঘিরে অপরিচিত মানুষ কী সহজেই বিচারক হয়ে উঠেছে! কিছুক্ষণ পর নীলার নিজের একটি পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছা হলো। কিন্তু কয়েকবার লিখে আবার মুছে ফেলল। মনে হলো, কেউ না কেউ হয়তো ভুল বুঝবে, কেউ ব্যঙ্গ করবে, কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণ করবে। শেষ পর্যন্ত সে মোবাইলটি পাশে রেখে দিল। কিন্তু ঘুম এলো না। তার মনে হলো, ‘সামাজিক মাধ্যমে আমরা কি সত্যিই সামাজিক হচ্ছি?’

প্রশ্নটি শুধু নীলার নয়। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের মতামত, অনুভূতি, ছবি, অভিজ্ঞতা কিংবা চিন্তা প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে যুক্তি, তর্ক, মতবিরোধ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণও যেন অনলাইন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। একটি সাধারণ মতামত মুহূর্তেই পরিণত হতে পারে উত্তপ্ত বিতর্কে। মতের অমিল খুব দ্রুত চলে যায় ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে।

মতের অমিল কি শত্রুতা

সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এখানে প্রত্যেকের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী যেমন নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন, তেমনি একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী কিংবা সাধারণ ব্যবহারকারীও নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই এত মানুষের মতামত এক হবে না। মতের পার্থক্য থাকা বরং সুস্থ সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা মতের সঙ্গে মানুষটিকেও এক করে ফেলি। কেউ একটি রাজনৈতিক বিষয়ে ভিন্ন মত প্রকাশ করলেন তাকে সঙ্গে সঙ্গে ‘অশিক্ষিত’ বা ‘খারাপ মানুষ’ বলে দেওয়া হলো। কেউ কোনো সিনেমা পছন্দ করলেন না তার রুচি নিয়ে প্রশ্ন তোলা। কেউ নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন সেটি নিয়ে শুরু হলো নৈতিক বিচার। অর্থাৎ, ‘তুমি ভুল বলেছ’ থেকে খুব দ্রুত কথাটি হয়ে যায়, ‘তুমি খারাপ।’ এই জায়গাটিই সামাজিক মাধ্যমকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে।

কেন এত দ্রুত উত্তেজনা ছড়ায়

সামাজিক মাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের পুরো জীবন দেখি না। দেখি কয়েকটি ছবি, কয়েকটি বাক্য কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও। সেই সামান্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই অনেক সময় একজন মানুষ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। এর সঙ্গে যোগ হয় অনলাইন যোগাযোগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এখানে মুখোমুখি যোগাযোগ নেই। সামনে বসে কাউকে যে কথা বলতে আমাদের সংকোচ হতে পারে, কিবোর্ডের আড়ালে বসে সেটিই অনেক সহজে লিখে ফেলা যায়। রাগের মুহূর্তে লেখা একটি মন্তব্য পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি করতে পারে। আর সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও এমন কনটেন্টকে বেশি দৃশ্যমান করে তুলতে পারে, যেগুলোতে মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশি। উত্তেজনাপূর্ণ, বিতর্কিত কিংবা চমকপ্রদ পোস্টে মন্তব্য, শেয়ার ও প্রতিক্রিয়া বেশি হলে সেটি আরও মানুষের সামনে পৌঁছাতে পারে। ফলে আমরা অনেক সময় না চাইলেও বিতর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ি।

নেটবিলাসী প্রজন্মের জন্য কতটা আশঙ্কা

যে প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে বেড়ে উঠছে, তাদের জীবনে অনলাইন জগতের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বেশি। একজন তরুণ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন দেখছেন। কেউ বিদেশে ঘুরছেন, কেউ নতুন চাকরি পেয়েছেন, কেউ বিয়ে করছেন, কেউ নতুন গাড়ি কিনেছেন, কেউ শরীরচর্চা করে নিজের চেহারা বদলে ফেলেছেন। অন্যদিকে নিজের বাস্তব জীবনের ক্লান্তি, ব্যর্থতা কিংবা অনিশ্চয়তা যখন সেই সাজানো ছবিগুলোর পাশে দাঁড়ায়, তখন নিজের জীবনকে ছোট মনে হতে পারে।

এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় অনলাইন অপমান, ট্রলিং কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য, তাহলে সামাজিক মাধ্যম আনন্দের জায়গার বদলে মানসিক চাপের উৎস হয়ে উঠতে পারে। পোস্টে পাওয়া একটি কটু মন্তব্য হয়তো লেখকের কাছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা। কিন্তু যার উদ্দেশে মন্তব্যটি করা হয়েছে, তার কাছে সারা দিনের মন খারাপের কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাক্সক্ষা অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। কতজন লাইক দিল, কে কী মন্তব্য করল, কেন কেউ আনফ্রেন্ড করল এসব ছোট ঘটনাও তাদের কাছে বড় হয়ে উঠতে পারে।

তাই অনলাইন আচরণ শুধু ‘অনলাইনের বিষয়’ নয়। এর প্রভাব বাস্তব জীবনের আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক ও মানসিক স্বস্তিতেও পড়তে পারে।

সোশ্যাল পজিটিভ হওয়া মানে কী

সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক থাকা মানে এই নয় যে সব সময় ভালো ভালো কথা বলতে কিংবা কোনো বিষয়ে সমালোচনা করা যাবে না। বরং ‘সোশ্যাল পজেটিভ’ হওয়া মানে হলো মতামত প্রকাশের সময় মানুষ হিসেবে অন্য ব্যক্তির মর্যাদাটুকু মনে রাখা। কেউ ভুল তথ্য দিলে সেটির প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গিয়ে ব্যক্তিকে অপমান করার প্রয়োজন নেই। সমালোচনা হতে পারে বক্তব্যের, আচরণের কিংবা সিদ্ধান্তের। ব্যক্তির অস্তিত্বকে আঘাত না করে। ‘আপনার এই তথ্যটি সঠিক নয়’ এটি একটি বক্তব্য। আর ‘আপনি কিছুই জানেন না’ এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ। দুটির মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য মনে হলেও সামাজিক মাধ্যমে সুস্থ পরিবেশ তৈরির জন্য পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব বিতর্কে অংশ নেওয়া জরুরি নয়

সামাজিক মাধ্যমে একটি বড় ভুল হলো প্রতিটি বিষয়ে নিজের মতামত জানানোকে দায়িত্ব মনে করা। সব বিতর্কে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উত্তেজিত করতে চাইলে তার সঙ্গে দীর্ঘ তর্কে জড়ানো অনেক সময় অর্থহীন। এমন কোনো আলোচনায় অংশ নেওয়ারও দরকার নেই, যেখানে অপর পক্ষের লক্ষ্য সত্য বোঝা নয়, বরং ঝগড়া করা। প্রয়োজনে ‘মিউট’, ‘আনফলো’, ‘ব্লক’ কিংবা ‘রেস্ট্রিক্ট’ ব্যবহার করাও স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস। এগুলো কাপুরুষতা নয়। বরং নিজের মানসিক শান্তির সীমা নির্ধারণের একটি উপায়।

নিজের ডিজিটাল ডায়েট তৈরি করুন

মনের সুস্থতার জন্য কী ধরনের কনটেন্ট গ্রহণ করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সারা দিন যদি শুধু নেতিবাচক সংবাদ, ঝগড়াপূর্ণ ভিডিও, ট্রল কিংবা বিতর্ক দেখি, তাহলে ধীরে ধীরে অনলাইন জগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণাটিও নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে। তাই সামাজিক মাধ্যমে একটি ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষামূলক কনটেন্ট, বই, শিল্প-সংস্কৃতি, প্রকৃতি, ভ্রমণ, সৃজনশীল কাজ কিংবা অনুপ্রেরণাদায়ক মানুষের কনটেন্টও নিজের ফিডে জায়গা দিতে হবে। কখনো কখনো সামাজিক মাধ্যম থেকে কয়েক ঘণ্টার বিরতিও নেওয়া যেতে পারে।

বাস্তব জীবনকে ভুলে গেলে চলবে না

সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হয়তো এখানেই আমরা ভার্চুয়াল জীবনের প্রতিক্রিয়াকে বাস্তব জীবনের মূল্য হিসেবে ভাবতে শুরু করি। একটি ছবিতে কম লাইক পাওয়া মানে এই নয় যে ছবিটি সুন্দর নয়। কেউ আপনার পোস্টে মন্তব্য করেনি মানে এই নয় যে আপনাকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। কেউ আপনার সঙ্গে একমত হয়নি মানে এই নয় যে আপনার মতামতের কোনো মূল্য নেই। আবার কোনো পোস্টে হাজার হাজার লাইক পাওয়া মানেই সেটি সত্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ এমনও নয়। অনলাইন জনপ্রিয়তা আর মানুষের প্রকৃত মূল্য এক জিনিস নয়। একটু সহানুভূতি, অনেকটা পরিবর্তন ফিরে আসা যাক নীলার কথায়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে আগের রাতের সেই পোস্টটি আবার দেখল। মন্তব্যগুলো পড়তে পড়তে এবার তার চোখে একটি মন্তব্য পড়ল ‘আপনার দিনটা হয়তো খুব খারাপ গেছে। আশা করি আজকের দিনটা একটু ভালো যাবে। নিজের যতœ নেবেন।’ মাত্র এক বাক্যের মন্তব্য।

কিন্তু নীলা ভাবল, কখনো কখনো সামাজিক মাধ্যমে বড় পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো বক্তব্যের প্রয়োজন হয় না। সহানুভূতিশীল বাক্যই যথেষ্ট। আমরা হয়তো জানি না, পর্দার ওপাশের মানুষটি ঠিক কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাই প্রতিটি মন্তব্যের আগে সামান্য মানবিকতা জরুরি। সামাজিক মাধ্যম শেষ পর্যন্ত মানুষেরই তৈরি একটি জায়গা। সেখানে প্রযুক্তি আছে, অ্যালগরিদম আছে, দ্রুততা আছে কিন্তু এর ব্যবহারকারীরা মানুষ। তাই মতের অমিল থাকবে, বিতর্ক থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু তার মধ্যেও ভদ্রতা, যুক্তি ও সহানুভূতির জায়গা তৈরি করা সম্ভব। ‘সোশ্যাল পজিটিভ’ থাকা মানে সবকিছুর সঙ্গে একমত হওয়া নয়। বরং দ্বিমত পোষণ করেও অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। একটি মন্তব্য করার আগে তাই একটু থামা যাক। একটি পোস্ট শেয়ার করার আগে যাচাই করা যাক।

সত্যিই কি এতে কিছু বদলাবে

আর কাউকে বিচার করার আগে মনে রাখা যাক পর্দার ওপাশে থাকা মানুষটিরও হয়তো এমন কিছু গল্প আছে, যা আমরা জানি না। সামাজিক মাধ্যমকে কাদা ছোড়াছুড়ির মুক্তমঞ্চ না বানিয়ে যদি আমরা একটু বেশি সচেতন, একটু বেশি সংবেদনশীল এবং একটু বেশি মানবিক হতে পারি, তাহলে ভার্চুয়াল জগৎটিও হয়ে উঠতে পারে বাস্তব জীবনের মতোই সুন্দর। কারণ শেষ পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমের পরিবেশ বদলানোর দায়িত্ব কোনো অ্যালগরিদমের নয় দায়িত্ব আমাদেরই।