যাত্রী নিরাপত্তায় একগুচ্ছ পরিকল্পনা

২০ আগস্ট আনুমানিক রাত ১১টা। কুমিল্লার আলেখারচর এলাকায় একটি মাইক্রোবাসের সামনের চাক্কায় ছুরি নিক্ষেপ করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত। উদ্দেশ্য ছিল গাড়িটি থামলে যাত্রীদের কাছ থেকে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া। কিন্তু চালক পরিস্থিতি বুঝে ১শ মিটার দূরে একটি হোটেলের সামনে গাড়ি দাঁড় করালে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। রাতের বেলায় পুলিশের টহলে গাফিলতি এবং হাইওয়ে থানার সংখ্যা কম থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মহাসড়কে প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটছে। এমন বাস্তবতায় যাত্রীদের নিরাপত্তায় মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে ৭০টি থানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মহাসড়ক নেটওয়ার্ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের এই মাধ্যমটি দিন দিন আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। সড়কে যানবাহন যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে যাত্রীদের নিরাপত্তার অভাব। পুলিশের নিয়মিত টহল না থাকা, হাইওয়ে পুলিশের পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় মহাসড়কগুলোয় অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ছে। তবে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে একাধিক সড়কে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রতি ৩৬ কিলোমিটার পরপর নতুন থানা স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। বর্তমানে জাতীয় মহাসড়ক ৯৬ ও আঞ্চলিক মহাসড়ক আছে ১২৬টি।

পুলিশ সূত্র জানায়, দেশের মহাসড়কগুলোকে অপরাধমুক্ত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। সবকটি মহাসড়কের ৩৬ কিলোমিটার পরপর থানা করার প্রস্তাব করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ইতিমধ্যে প্রস্তাবটি পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু উদ্যোগ নেওয়ার আগেই সরকারের পতন হয়। বিশে^র অন্যান্য দেশের আদলেই মূলত সড়ক নিরাপত্তা সাজানোর পরিকল্পনা করছে পুলিশ।

এই প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ৭০-৮০% ঘটনাই ঘটে রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে। এই সময়ে দূরপাল্লার বাসগুলোর চালকরা ক্লান্ত থাকেন এবং পুলিশের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা-গোমতী সেতু সংলগ্ন এলাকা, ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ ও শেরপুর অংশ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদী-ভৈরব অংশ অপরাধীদের নিরাপদ জোন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঘন ঝোপঝাড় ও নিরবচ্ছিন্ন আলোর অভাব অপরাধীদের সুবিধা বাড়িয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, সড়ক-মহাসড়ক কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে আনা হচ্ছে। মহাসড়কে নতুন থানা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহাসড়কে কোনো অপরাধ সংঘটিত হতে দেওয়া হবে না। হাইওয়ে পুলিশের জন্য উন্নতমানের যানবাহনও কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এবং পুলিশের কর্মকা-ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে মহাসড়ক।

পুলিশ সূত্র আরও জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদন বলা হয়, ৭০টি স্থানে প্রায়ই ছিনতাই-ডাকাতিসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এ জন্য ওইসব স্থানে নতুন থানা করতে হবে। স্থানগুলো হচ্ছে কক্সাবাজারের মেরিন ড্রাইভ, সাবরাং, মহেশপুর; রাঙ্গামাটি সদর, কাপ্তাই; খাগড়াছড়ির দিঘীনালা; বান্দরবানের চিম্বুক, নীলাচল; নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, রাজশাহীর গোদাগাড়ী; নওগাঁর মান্দা, পত্মীতলা, নওহাটা; বগুড়ার মহাস্থানগড়, শেরপুর; চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, জয়পুরহাটের কালাই, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, রংপুরের কাউনিয়া, কুড়িগ্রামের নাগেরশ^রী, লালমনিরহাটের সদর; দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, দিনাজপুর সদর, ঘোড়াঘাট; ঠাকুরগাঁও সদর, নীলফামারীর জলঢাকা, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী; টাঙ্গাইলের নাগরপুর, এলেঙ্গা; গাজীপুরের চন্দ্রা, নরসিংদীর ঘোড়াশাল; ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ, মুক্তাগাছা; জামালপুরের সরিষাবাড়ী, শেরপুরের গৌড়দ্বার, ফরিদপুরের মুন্সিবাজার; গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, ভাটিয়াপাড়া; শরিয়তপুরের জাজিরা; বাগেরহাটের মোল্লারহাট, খানজাহান আলী, মোংলা; সাতক্ষীরা সদর, ঝিনাইদহের আরাপপুর, নড়াইলের লোহাগড়া, কুষ্টিয়ার গড়াই; চুয়াডাঙ্গা সদর, দর্শনা; মেহেরপুর সদর, মাদারীপুরের মোস্তফাপুর, যশোরের খাজুরা, পিরোজপুর সদর; ঝালকাঠির গাবখান, দপদপিয়া; ভোলার বাংলাবাজার, চরফ্যাশন; পটুয়াখালীর পায়রা, লেবুখালী, কুয়াকাটা; বরগুনার আমতলী, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন; সিলেটের চারখাই, ফেঞ্চুগঞ্জের ভোলাগঞ্জ; হবিগঞ্জের মাধবপুর, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দাবাদ। প্রতিটি উন্নত দেশের এক্সপ্রেসওয়েতে ফোন বা বার্তা পাওয়ার ৫ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যে পুলিশের টহল গাড়ি উপস্থিত হয়।

সূত্র জানায়, হাইওয়ে পুলিশের জন্য যানবাহনও সংকট আছে। ইতিমধ্যে জিপ ২১টি, কমান্ড ভেহিক্যাল ১টি, অপারেশন ভেহিক্যাল জিপ ১টি, প্যাট্রল কার ৪৮২টি, অ্যাম্বুলেন্স ১৪৩টি, মোটরসাইকেল (৭৫০ সিসি) ৫৮০টি, রেকার ১০৯টি, ট্রাক ১০টি, ক্রেন ২টি, মাইক্রোবাস ২২টি, মিনিবাস ১১টি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আমিনবাজার থেকে হাটিকুমরুল, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, সিলেট, পোস্তগোলা;  মোংলা ও ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে হাইওয়ে সদর দপ্তর।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তকে বলেন, যুক্তরাজ্যে মহাসড়কগুলোতে তিন হাজার সিসির জিপ ব্যবহার করেন কর্মকর্তারা। কাতারের হাইওয়ে পুলিশ ৫৫শ সিসির নিশান পেট্রোল, মালয়েশিয়ায় ২৫শ সিসির নিশান এক্সট্রিল, পাকিস্তানে ২৭৫৫ সিসির টয়োটা প্রাডো, ভারতে ১৪শ সিসির টাটা ইন্ডিগো, জাপানে ২৫শ সিসির টয়োটা ক্রাউন, কানাডায় ৪৬শ সিসির ফ্রড ক্রাউন ভিক্টোরিয়া, সুইজারল্যান্ডে ৩৯৪২ সিসির মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি ব্যবহার করে। এ রকম গাড়ি আনারও পরিকল্পনা আছে আমাদের। সড়কে স্থাপিত ক্যামেরাগুলোতে অন্ধকার ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়াতেও স্পষ্ট ছবি ক্যাপচারসহ যানবাহনের নম্বর প্লেটের ছবি ক্যাপচার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তারপর আছে মোংলা। অন্যান্য এলাকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকা ঘিরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প গড়ে উঠছে। পাশাপাশি প্রতিদিন মহাসড়ক দিয়ে কাভার্ডভ্যানে করে ঢাকায় এবং ঢাকা থেকেও বিভিন্ন মালামাল চট্টগ্রামে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি ও সড়কে কাভার্ডভ্যান থেকে মালামাল লুটের অভিযোগ আছে। মহাসড়ক অপরাধমুক্ত করার চেষ্টা করছি। পুলিশের কোনো সদস্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ অভিযোগ উঠেছে, টহল পুলিশ সড়কে থাকলেও তারা যানবাহন আটকে ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া রাতের বেলায় টহলে গাফিলতি করছে। ইতিমধ্যে তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।