বেতন বেড়েছে দুর্নীতি কমুক

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১২ এএম

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ অর্থনীতিতে একটি পজিটিভ ভাইভ তৈরি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচ্ছলতা অর্জন এবং দুর্নীতির প্রতি সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। এতে  করের পরিধি বৃদ্ধি পাবে এবং নিম্নস্তরের সরকারি কর্মচারীরা দারিদ্রসীমার ওপর উঠে আসবেন। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শী আর্থিক ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা শতভাগ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ফলে বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সর্বনিম্ন সরকারি কর্মচারীর বর্ধিত বেতনের সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বেতনের পার্থক্যকেও বড় বৈষম্য তৈরি হবে বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সঙ্গে তারা মনে করেন, শুধু বেতন বাড়ালেই চলবে না। জরুরি ভিত্তিতে দুর্নীতির লাগামও টানতে হবে। সরকার বেতন বাড়িয়েছে, এবার দুর্নীতি করলে কঠোর ব্যবস্থা এই বার্তাও শক্তভাবে দিতে হবে।

এদিকে, বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কবে সেই অর্থ পাবেন, তা জানানো হয়নি। যদিও বর্ধিত বেতন পরিশোধের সময় গত জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকেই হবে বলে সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে। বর্ধিত বেতন-ভাতা ২ বছরে ধাপে ধাপে পরিশোধের যে রোডম্যাপ সরকার দিয়েছে, তাতে নিত্যপণ্যের বাজারে তাৎক্ষণিক তেমন প্রভাব পড়েনি। গত সোমবার সন্ধ্যায় পে-স্কেল অনুমোদনের পর গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বাজারে দ্রব্যমূল্যে তেমন পরিবর্তন চোখে পড়েনি। তবে, গতকালই ব্যবসায়ীদের বৃহৎ সংগঠন, বাংলাদেশ বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) সব ব্যবসায়ী নেতাদের ডেকে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার ও সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগের বার্তা দিয়েছে।  

গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথাও জানান।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, পে-স্কেল বাস্তবায়ন হতে শুরু করলে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাজারে যাবে এবং তা অর্থনীতিতে একটি ‘পজিটিভ ভাইভ’ সৃষ্টি করবে। এতে নিচের দিকের সরকারি কর্মচারীরা একটু বেশি নগদ অর্থ হাতে পাবেন এবং তাদের জীবনযাত্রাকে দারিদ্রসীমার ওপর তুলতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে এবং ফলশ্রুতিতে র্কর্মজীবী-শ্রমজীবীদের হাতেও বাড়তি অর্থ যাবে। তিনি বলেন, নতুন পে-স্কেল মূলত দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশকে (সুবিধাভোগীদের) স্বচ্ছল জীবনযাপনের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করল। এর মাধ্যমে সরকারের শুধু ব্যয়ই বাড়বে না; আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কারণ, সরকারের কর আদায়ের পরিধিও বেড়ে যাবে।

বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতিতে জড়ানোর প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে, সরকারের এমন দর্শন কতটা কাজে আসবে? এই প্রশ্নের জবাবে ড. এ কে এনামুল হক বলেন, বেতন কম বা বেশি তা দুর্নীতির প্রবণতাকে প্রভাবিত করে না। কেবলমাত্র দুর্নীতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই দুর্নীতি রোধ হবে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লে নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যায় বা বাড়িয়ে দেওয়া হয়, এটি একটি ধারণাগত মূল্যস্ফীতি। অতীতে এমনটি হয়ে এসেছে। এবারও হতে পারে। কিন্তু কয়েক ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের যে রোডম্যাপ সরকার দিয়েছে, তা দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং এতে মূল্যস্ফীতিতে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। তিনি বলেন, অতীতেও (২০১৫ সালে) দুই দফায় বেতন ও ভাতা দেওয়া হয়েছিল। এবারই প্রথম কয়েক ধাপে বেতন ও পরবর্তী পর্যায়ে ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও দূরদর্শীতার সঙ্গে হতে হবে।

ফিরোজ মিয়া বলেন, নতুন পে-স্কেল আয় বিবেচনায় বাজারে দুই ধরনের ক্রেতা সৃষ্টি করল। একই বাজার; কিন্তু ক্রেতার সক্ষমতা দুই রকমের। সরকারি চাকরিজীবীরা তো বর্ধিত বেতন পাবেনই। কিন্তু বেসরকারি খাতের কর্মজীবীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবেন। কারণ, বিদ্যমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বেসরকারি খাত এই মুহূর্তে বেতন-ভাতা বাড়াতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। সরকার এই পরিস্থিতি উত্তরণে বেসরকারি খাত পুনরুদ্ধারে বিরাট অঙ্কের অর্থায়ন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও বাস্তবায়নের পথে। কিন্তু এই অর্থায়ন সুবিধা হতে হবে কার্যকরী। সঠিকভাবে অর্থায়ন না হলে পরবর্তী পরিস্থিতি সরকার সামলাতে অসুবিধা হয়ে যাবে।     

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অনুমোদিত নতুন বেতন কাঠামোর কারণে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়তে পারে। গতকাল সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারি বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি নিয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি বেশি। বর্তমানে তা কিছুটা কমলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার তার প্রতিশ্রুতি থেকেই সক্রিয় রয়েছে।

এদিকে, পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরের দিন গতকাল সকালে এফবিসিসিআই এক জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারাসহ নিত্যপণ্যের আমদানিকারক এবং করপোরেট গ্রুপগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু বাজার অভিযান ও জরিমানার ওপর নির্ভর না করে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে আলোচনা ও একে অপরকে দোষারোপের পরিবর্তে সমস্যার উৎস চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানে যেতে হবে। শুধু খুচরা বাজারে অভিযান না চালিয়ে আমদানি, এলসি, উৎপাদন, মিলগেট, পাইকারি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার পুরো শৃঙ্খলকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। তারা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়।

সভাপতির বক্তব্যে এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ী ও ভোক্তার কল্যাণে হলে ব্যবসায়ী সমাজ তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। বাজারের সমস্যাগুলো আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে হবে। কোন পণ্যের দাম কেন বাড়ছে, আমদানি ও সরবরাহে কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে মূল্য বাড়ছে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে যেতে হবে।

গতকাল সকালে ও বিকেলে মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার, মতিঝিলের দিলকুশা কাঁচাবাজার, সকালে মেরাদিয়া ও শান্তিনগর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাছ-মুরগিসহ তেল, চাল, পেঁয়াজ, রসুন ও সবজির দরে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। মেরাদিয়া বাজারে চাল ও মুদি সামগ্রী বিক্রেতা সজীব বলেন, এখন এমনিতেই সময় খারাপ। মাস শুধু শেষ হলো। ক্রেতা পাওয়াই মুশকিল। বাড়তি দামের কথা কেউই ভাবছে না। কিন্তু আড়তে বেশি দাম নিলে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হবে।

অন্যদিকে নতুন পে-স্কেল অনুমোদন দেওয়ায় চলতি মাস থেকেই নতুন করে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির নোটিস পেয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভাড়াটিয়ারা। তাই পে-স্কেলের খবরে বাড়িভাড়া বাবদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে অনেক বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মিরপুর-২ এর বাসিন্দা এনজিও কর্মী সাজিদুল ইসলাম বাসা মেরামতের কারণে অক্টোবর থেকে নতুন বাসায় উঠতে বাসা খোঁজ করছেন। তিনি বলেন, মিরপুর-২ এলাকায় এক বছর আগে যে বাসা ভাড়া ছিল ১৫ হাজার টাকা। সেই বাসা ভাড়া পে-স্কেলের আগেই ১৮ থেকে ২২ হাজার চাইছিল। এখন পে-স্কেলের ঘোষণায় বাসা ভাড়া কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় জানি না। তবে, রাজধানীর কোনো রুটে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন : বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়েছে। সংগঠনটি নতুন পে-স্কেলকে স্বাধীনতার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘ঐতিহাসিক, অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগোপযোগী’ বেতন কাঠামো হিসেবে অভিহিত করেছে।

নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পরপরই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম এ কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, অতীতে কোনো বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য এত ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ১১ বছর বেতন কাঠামোর পরিবর্তন না হওয়ায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারি কর্মচারীদের পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও দাবির প্রতি যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত