দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে ১৭ বছরের কিশোরের ‘ঘুষ.সাইট’

মায়ের মৃত্যুর পর প্রাপ্য সরকারি পাওনা তুলতে গিয়ে দুর্নীতি ও ঘুষের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ ও তার পরিবার। পরবর্তীতে নিজের পাসপোর্ট করতে গিয়েও একই ধরনের হয়রানির শিকার হন তিনি। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পেছনে ফেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ব্যতিক্রমী প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিয়েছে এই তরুণ। পরিচয় গোপন রেখে নাগরিকরা যেন তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘুষ দাবির কথা জানাতে পারেন, সে লক্ষ্যে সে গড়ে তুলেছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি উন্মুক্ত ওয়েবসাইট।

ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ আগস্ট চালুর পর থেকে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টা পর্যন্ত সেখানে মোট ১১ হাজার ৬৬৬টি অভিযোগ নিবন্ধিত হয়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের সমন্বিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা। তবে উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, জমা পড়া প্রতিটি তথ্য যাচাইকৃত—এমন দাবি তাঁরা করছেন না। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য বর্তমানে চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম কাজ করছে।

উদ্যোক্তা শাহেদ ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় তার বাবার সাথে থাকে এবং কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে অধ্যয়নরত। তার বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম পূর্বে সৌদির একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মূল বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। শাহেদের মা মরহুমা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, যিনি ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর মারা যান।

পরিবারের অভিযোগ, আমিনা খাতুনের প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ধাপে ধাপে মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া কল্যাণ তহবিল ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য বকেয়া ১০ লাখ টাকা পেতে তাঁদের কাছে সরাসরি এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়।

তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন জানান, বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বকেয়া দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন। ইতোমধ্যে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু করবে।

ভারতে প্রচলিত একটি ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শাহেদ নিজের কোডিং দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মাত্র ২ ঘণ্টায় সাইটটির প্রাথমিক কাঠামো সাজায়। পরে বন্ধু সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কিনে ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। বর্তমানে প্রযুক্তিগত দিক শাহেদ এবং বিপণন ও প্রচার সাইফ কবির দেখছে। আইনি ঝুঁকি এড়াতে আপাতত অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে।

উদ্যোগটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর শাহেদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় যোগাযোগ করেছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন তাকে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর কথা জানান। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ‘সুজন’ সম্পাদক আলী ইউসুফ এই উদ্যোগের প্রশংসা করে আইনগত সহায়তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য দুর্নীতির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা, যাতে ভবিষ্যতে কাউকে সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দিতে না হয়।