নিরাপত্তা ঝুঁকিতে গাজীপুর জেলা কারাগার

গাজীপুর জেলা কারাগারের নিরাপত্তাব্যবস্থা চরমঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারাগারের উত্তর-পশ্চিম সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে নির্মিত দুটি আবাসিক ভবন এবং পশ্চিম পাশে একটি মোবাইল টাওয়ারকে কারাগারের নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কারাগারের পূর্ব পাশে একটি ডেইরি কারখানার জেনারেটরের শব্দে অতিষ্ঠ বন্দি ও কারা কর্তৃপক্ষ। 

গাজীপুর জেলা কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ৫ দশমিক ৯৪ একর আয়তনের কারাগারটির ৩৩৭ বন্দির ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বন্দি রয়েছে। এদের মধ্যে অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি এবং মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দুর্ধর্ষ প্রকৃতির আসামি রয়েছে, যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারাগারের উত্তর-পশ্চিম সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে  মো. গনি মিয়া এবং মো. আ. মান্নান দুটি আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছেন। কারাবিধি অনুযায়ী, কারাগারের সীমানাপ্রাচীরের বাইরে ১৬ ফুটের মধ্যে কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও এ ভবন দুটি নির্মাণের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। এ ছাড়া কারাগারের পশ্চিম পাশে গ্রামীণফোন লিমিটেডের একটি সুউচ্চ মোবাইল টাওয়ার রয়েছে। টাওয়ারটিতে কোনো নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় যে কেউ অনায়াসেই এতে আরোহণ করতে পারে।

এদিকে গাজীপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ রফিকুল কাদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই ভবন ও টাওয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে কারাগারের ভেতর নজরদারি করা, বন্দিদের কাছে মোবাইল ফোন, মাদক বা বিস্ফোরক সরবরাহ করা এবং নাশকতামূলক কর্মকা- পরিচালনা করা সহজ হয়ে পড়েছে। এমনকি মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত বিকিরণ বন্দিদের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরেজমিন কারাগারে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের ভবনগুলো কারাগারের ভবন থেকেও উঁচু। কারাবন্দিরা ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখতে পারে। এ ছাড়া টাওয়ার পাশেই থাকায় সেখান থেকে স্পষ্টভাবে কারাগারের সবকিছু দেখতে পাওয়া যায়। কারাগারের পূর্ব পাশে থাকা আড়ং ডেইরি কারখানার ভবনগুলোও উঁচু। ওই কারখানার জেনারেটরের শব্দে কারাগারের ভেতরে থাকা দায়। পূর্ব পাশে কারাগারের দেয়াল নিচ দিয়ে ফাঁকা রয়েছে। সেখান দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ অনায়াসে ঢুকতে ও বের হতে পারে। কয়েকজন বন্দির সঙ্গে কথা হয় কারাগারের মধ্যে। তারা বলেন, ‘আমরা ভেতর হতে পাশের বিল্ডিংয়ের সবকিছু দেখতে পারি। আমাদের সবকিছু তারা দেখতে পারে। আর কোনো জেলে এমন অবস্থা আছে বলে জানা নেই। পাশের এ কারখানা থেকে ২৪ ঘণ্টা জেনারেটরের শব্দ আসে। আমরা ঠিকভাবে ঘুমাতে পারি না। আমরা এসব থেকে পরিত্রাণ চাই।’

গাজীপুর জেলা কারাগারের জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘কারাগারের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে যেসব সমস্যা হচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’

গাজীপুর জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়েছি, কারা বিধি অনুযায়ী ভবন নির্মাণ এবং কারখানা নির্মাণের যে বিধান রয়েছে, সেটি অমান্য করা হয়েছে। উচ্চতা ও দূরত্ব জেলকোডের কোনো নিয়ম মেনে করা হয়নি। এটি আমি লিখিতভাবে সরকারের নজরে আনব। পশ্চিম পাশের দেয়াল ঘেঁষে গ্রামীণফোনের বিশাল একটি টাওয়ার রয়েছে। সেটি যেকোনো সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আরেকটি বিষয় যেটি দেখেছি, কারাগারের উত্তর-পশ্চিম কর্নারে একটি তিনতলা ভবন রয়েছে। ওই ভবনটি একেবারে দেয়ালঘেঁষা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হবে। কারাগারের পূর্ব পাশে একটি মিল্ক ফ্যাক্টরি রয়েছে। সেই মিল্ক ফ্যাক্টরির শব্দ কারাগারে প্রবেশ করে। এতে করে কারাগারের ৫টি ইউনিটের বন্দিদের সমস্যা হচ্ছে। এ তিনটি বিষয়েই কারাগারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।’