ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকার বাইরের ২০ জেলা

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ এএম

দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে ১ হাজার ১১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। এর আগের ২৪ ঘণ্টায়ও ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই সময় ভর্তি হয়েছিল ১ হাজার ৩২৪ জন। প্রতিদিনই ১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এভাবে রোগী বাড়তে থাকলে হাসপাতালে তাদের সামাল দেওয়া মুশকিল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চলতি সেপ্টেম্বরে এবং আগামী অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

যদিও বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছিলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপর ঢাকায় কিছু কাজ হয়। কিন্তু ঢাকার বাইরে তেমন কোনো কাজ চোখে পড়েনি। গত বছর বরিশাল বিভাগের পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। এবার তার পাশের বিভাগ খুলনার পরিস্থিতিও খারাপ। খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বরিশালের সমান হলেও মৃত্যু খুলনায় বেশি। তবে দুয়েক দিনে বরিশালের চেয়ে খুলনায় রোগী বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুধু এ দুটিই নয়, ঢাকার বাইরে ২০ জেলার চিত্রই উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন হটস্পটগুলো ম্যানেজ করতে হবে। যেসব জায়গায় আক্রান্ত বেশি হচ্ছে, সেসব জায়গায় মশা নিধনের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। যত গড়িমসি করা হবে, ততই রোগী বাড়তে থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আক্রান্ত ঠেকানো গেলে হাসপাতালে চাপ পড়ে না। যেখানে বেশি আক্রান্ত হয়, সেখানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কী পদক্ষেপ নিতে হবে তাও আমরা জানি। শুধু সভা করে ডেঙ্গু ঠেকানো অসম্ভব। সব কাজই সমানভাবে করতে হবে। আক্রান্ত না ঠেকাতে পারলে হাসপাতালে চাপ পড়বে এটাই স্বাভাবিক। আর তখন দোষ হয় স্বাস্থ্য বিভাগের। স্বাস্থ্য বিভাগ তো আক্রান্ত ঠেকাতে পারবে না। এটা যাদের কাজ তারা ঠিকমতো করলে হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের সাফল্য হচ্ছে, আক্রান্ত বেশি হলেও এবার মৃত্যু তুলনামূলক কম। সুস্থ হওয়ার হার বেশি। কিন্তু রোগী বেড়ে গেলে তখন সামাল দিতে তো আমাদের হিমসিম খেতে হবে। মৃত্যুর হারও তখন বেড়ে যাবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘হটস্পটগুলোয় দ্রুত মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম চালাতে হবে। সেই সঙ্গে জনগণকে জানানো যে, ডেঙ্গুরোগী যেন মশারির বাইরে না আসে। এ ছাড়া ওই সব এলাকার মানুষকেও সচেতন থাকতে হবে। যারা আক্রান্ত হননি, তারাও যেন দিনে-রাতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমান।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুয়ায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ হাজার ২৮০ জন। মৃত্যু হয়েছে ১০৭ জনের। ২০২৫ সালে এ সময়সীমায় ভর্তি হয় ৩২ হাজার ৫০১ জন, মৃত্যু হয় ১২৫ জনের। গতবারের তুলনায় এবার ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু মৃত্যু কম। গত বছর এ পর্যন্ত ২৬০ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এবার সেখানে ৩৫৭ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

চলতি বছরে বরিশাল বিভাগে ৬ হাজার ৬৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় ১০ জনের। চট্টগ্রামে ভর্তি হয় ৫ হাজার ৭৫২ জন, মৃত্যু হয় ৭ জনের। ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ভর্তি হয় ৫ হাজার ৫১৩ জন, মৃত্যু হয় ৩ জনের। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ভর্তি হয় ৪ হাজার ৬২০ জন, মৃত্যু হয় ১৫ জনের। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভর্তি হয় ৫ হাজার ৪৯ জন, মৃত্যু হয় ৩৬ জনের। খুলনায় ভর্তি হয় ৬ হাজার ৫ জন, মৃত্যু হয় ১৮ জনের। ময়মনসিংহে ২ হাজার ৬৩ জন ভর্তি, মৃত্যু ১২ জনের। রাজশাহীতে ২ হাজার ৭২ জন ভর্তি হয়, মৃত্যু হয় ৪ জনের,  রংপুরে ৯৫৯ জন এবং সিলেটে ১৭৮ ভর্তি হয়েছেন এ দুই বিভাগে একজন করে মারা গেছে। ঢাকার দুই সিটির হাসপাতালে ভর্তি রোগীর বড় একটা অংশ ঢাকা বিভাগ ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের মধ্যে রোগী বেশি খুলনা ও বাগেরহাট জেলায়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার খুলনা জেলায় প্রায় ১১ গুণ, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) প্রায় ৮ গুণ এবং বাগেরহাটে প্রায় ১০ গুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া এই বিভাগে যশোরে ভর্তি হয়েছে ৫৪৬ জন।

খুলনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, খুলনার সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও প্রতিটি প্রাইভেট হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। খুলনা শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. প্রদীপ দেবনাথ জানান, সম্প্রতি খুলনায় শিশুদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিদিন ১০০ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলে তার মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জন শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত পাওয়া যায়। হাসপাতালে বেডের সংখ্যা কম থাকায় অধিকাংশ শিশুকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগামী আরও ১৫ থেকে ২০ দিন এই অবস্থা চলতে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগের মধ্যে এবার রোগী বেশি পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায়। পিরোজপুরে এবার ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫ ৯৪ জন, ঝালকাঠিতে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বান্দরবান, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এই ২০ জেলায় দ্রুত মশা নিধনে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের এ জেলাগুলোর হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনার সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে ডেঙ্গু মোকাবিলা করা সহজ হবে। না হলে নাগালের বাইরে চলে যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এবার মৃত্যু তুলনামূলক অনেক কম। ডাক্তারদের দায়িত্ব চিকিৎসা দেওয়া এবং মৃত্যু কমিয়ে আনা। গত বছরের তুলনায় এবার মৃত্যু অনেক কম। আক্রান্ত তো আমরা কমাতে পারব না। আক্রান্ত কমলে হাসপাতালের ওপরও চাপ কম হয়। আক্রান্ত যাতে না হয়, সেদিকেই বেশি নজর দেওয়া দরকার। সামনে রোগী বেড়ে গেলে হাসপাতালে চাপ সামাল দেওয়া একটু কঠিনই হবে। রোগী বেড়ে গেলে মৃত্যুও বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে একজন,  জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন ও সেপ্টেম্বরের দুই দিনে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারিতে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে ২ হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন এবং সেপ্টেম্বরের দুই দিনে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৪৩৪ জন। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ৬২.১ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৯ শতাংশ নারী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত