সন্দ্বীপ চ্যানেলে ডুবোচরে ৯ ঘণ্টা আটকা ফেরি, যাত্রীদের দুর্ভোগ

সন্দ্বীপ চ্যানেলে ডুবোচরে আটকে প্রায় নয় ঘণ্টা স্থবির থাকার পর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটে পৌঁছেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ফেরি কপোতাক্ষ। তবে ঘাটে পৌঁছানোর পরও অতিরিক্ত জোয়ারের কারণে ফেরি থেকে যানবাহন ও যাত্রী নামানো সম্ভব না হওয়ায় নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন শতাধিক যাত্রী।

বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে সন্দ্বীপ থেকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর চ্যানেলের ডুবোচরে আটকে যায় ফেরিটি। দীর্ঘ প্রায় নয় ঘণ্টা পর রাত ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে ফেরিটি আবার চলতে শুরু করে। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটে পৌঁছালেও জোয়ারের কারণে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো ফেরি থেকে নামানো সম্ভব হয়নি।

ফেরিটিতে প্রায় ২৫০ জন যাত্রী ছাড়াও পণ্যবাহী ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় যাত্রীদের অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। শিশু, অসুস্থ রোগী ও নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল বেশি।

ফেরিতে থাকা চট্টগ্রাম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্সের শিক্ষার্থী অবনী বলেন, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে সন্দ্বীপের এনাম নাহার থেকে এক্সপ্রেস বাসে করে ফেরিতে ওঠেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় ফেরিতে কাটানোর পরও কখন ঘাট থেকে নামতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘সারারাত বসেই কাটিয়েছি। রাতে অনেক শিশু কান্নাকাটি করেছে। ফেরিতে থাকা অসুস্থ রোগীদের নিয়েও সবাই উদ্বিগ্ন ছিলেন।’

ঘাটে পৌঁছেও নামার সুযোগ নেইঃ ফেরি বাঁশবাড়িয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর নতুন করে সংকট তৈরি হয়। অতিরিক্ত জোয়ারের পানির কারণে ফেরিতে থাকা বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি নামানো সম্ভব হয়নি বলে জানান চালকেরা। এসব যানবাহনে শতাধিক যাত্রী রয়েছেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, ফেরি থেকে যানবাহন ও যাত্রী ওঠানামার সুবিধার্থে হাই ওয়াটার ঘাটের অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো চালু হয়নি। ফলে জোয়ারের সময় ফেরি ঘাটে পৌঁছালেও যানবাহন ও যাত্রী নামানো সম্ভব হয় না।

বৃহস্পতিবার ভোরে ফেরি বাঁশবাড়িয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর কিছু যাত্রী লালবোটে করে কূলে নামেন।

বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (পোর্ট অফিসার) নয়ন শীল বলেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভাটা শুরু হলে যাত্রী ও যানবাহনগুলো ফেরি থেকে নামতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত ড্রেজিংয়ের বিষয়ে আমরা কথা বলব। পন্টুনের ব্যবস্থা করা হলে হাই ওয়াটার ঘাট চালু করা সম্ভব হবে। তখন অতিরিক্ত জোয়ারের সময়ও ফেরি থেকে যাত্রী ও যানবাহন নামাতে এ ধরনের সমস্যা হবে না।’

খাবার-পানির সংকট, ছুটে যান স্বেচ্ছাসেবকেরাঃ ফেরিটি ডুবোচরে আটকে পড়ার পর যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ফেরিতে খাবার ও সুপেয় পানির সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ৯টার পর যাত্রীদের জন্য শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতা শহিদুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের নেতা আমজাদ হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামী সন্দ্বীপ শাখার তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবকেরা ফেরিতে খাবার পৌঁছে দেন। ভাটার কারণে লালবোটে করে এবং বালুচর পেরিয়ে খাবার পৌঁছে দিতে তাঁদের বেশ বেগ পেতে হয়।

গভীর রাতে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার পৃষ্ঠপোষকতায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা প্রায় ৫০০ মানুষের জন্য রান্না করা খাবার ও সুপেয় পানি নিয়ে ফেরিতে যান। জামায়াতের পক্ষ থেকেও রাতে যাত্রীদের মধ্যে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন ফেরিতে গিয়ে আটকে থাকা যাত্রীদের খোঁজখবর নেন।

স্বজনদের উৎকণ্ঠায় কেটেছে রাতঃ ফেরিতে স্বজনরা আটকে থাকায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রাত কাটান তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও। মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী সন্দ্বীপের বাসিন্দা সাদিক খান বলেন, ‘আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মো. সেলিম খান ফেরিতে কীভাবে আছেন, তা নিয়ে টেনশনে আছি।

’সন্দ্বীপের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদারুল আলম বলেন, ‘আমার মেয়েকে ফেরিতে পাঠিয়ে সারারাত উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটিয়েছি।’ফেরিতে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা কয়েকজন রোগীও দীর্ঘ সময় আটকে ছিলেন। ভাটার আগে তাঁদের নামানো সম্ভব হয়নি। শ্বাসকষ্টে থাকা চার-পাঁচজন শিশুরোগীর অবস্থা জানতে ফেরিমাস্টার সাইফুলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

ফেরিমাস্টারের অপরিপক্বতাকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষঃ বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (পোর্ট অফিসার) নয়ন শীল বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ফেরিমাস্টারের অপরিপক্বতার কারণেই ফেরিটি ডুবোচরে আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম নৌপথে নাব্যতা সংকটের অভিযোগ করে আসছেন যাত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ড্রেজিং না করায় চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর তৈরি হয়েছে। এতে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ফেরি চলাচল।

এর আগেও ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর একই স্থানে নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ফেরিমাস্টার সাইফুল ইসলামও বিভিন্ন সময় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের জানিয়েছিলেন, পর্যাপ্ত ড্রেজিং করা না হলে যেকোনো সময় ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

দ্রুত ড্রেজিংয়ের দাবিঃ সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম নৌপথে নিয়মিত যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত ড্রেজিংয়ের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত নাব্যতা সংকট, ডুবোচরে ফেরি আটকে যাওয়া এবং জোয়ারের সময় ঘাটে যাত্রী ও যানবাহন ওঠানামায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

যাত্রীরা দ্রুত চ্যানেলে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করার পাশাপাশি হাই ওয়াটার ঘাট চালু এবং ফেরি চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।