চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষায় যেমন তুলনামূলক খরচ কম, একই সঙ্গে গুণগত মানও উন্নত। এই প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলের দেশ ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের মেডিকেল শিক্ষায় বাংলাদেশের দিকে আগ্রহ বেশি। আর এর সুযোগে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট কীভাবে নিজেদের আখের গোছাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা-ই ৩ সেপ্টেম্বর উঠে আসে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে। সিন্ডিকেটের পরিসর ছড়িয়েছে দেশের সীমানার বাইরেও। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেলগুলোতে ভর্তির সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, সরকারি মেডিকেলে ভর্তিও নিয়ন্ত্রণ করে এই চক্র। সিন্ডিকেটের কারণে স্বাভাবিক খরচের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে তারা নানা জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত আছেন বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কিছু কর্তাব্যক্তি, মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধুরা। আছেন ভারতীয় চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট আরও অনেকেই। ক্ষেত্রটি যেন অনাচার-দুরাচারের চারণভূমি হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ আছে, এ ক্ষেত্রে বিদেশিদের অথরাইজেশনের যে বিধিবদ্ধ নিয়মনীতি আছে এর তোয়াক্কা করে না মেডিকেল কলেজগুলো। বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নেওয়ার নিয়মও লঙ্ঘন করেছে কলেজগুলো। তারা সরকারকে কোনো টেক্স দেয় না। এর ফলে বিপুল রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। আর্থিক লেনদেনও হচ্ছে অবৈধ পথে। সিন্ডিকেটের হোতারা নানা ছলছাতুরি ও জালিয়াতির মাধ্যমে যোগ্যতা নেই, এমন শিক্ষার্থীদের নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে ভর্তি করিয়ে থাকে, এও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। এই বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যে অজানা নয়, তা দেশ রূপান্তরে ঊর্ধ্বতন কয়েকজনের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট। কিন্তু তাদের এ সংক্রান্ত বক্তব্য স্বচ্ছতা কিংবা নীতিমালা অনুসারে কতটা প্রশ্নমুক্ত তা জিজ্ঞাসার ঊর্ধ্বে নয়। বিষয়গুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জানা নেই তা নিশ্চয়ই স্বাভাবিকতার মধ্যে পড়ে না। আমরা জানি, মেডিকেলে ভর্তির সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। কিন্তু একদিকে এর ব্যত্যয় ঘটছে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক আয়ে অভিঘাত লাগছে। আর নিয়মনীতির অবজ্ঞা বা উপেক্ষার বহুমুখী নেতিবাচকতা তো রয়েছেই।
শিক্ষায় অনাচার, দুর্নীতি, নৈতিকতার অবক্ষয়ের ছায়া কীভাবে বিস্তৃত হচ্ছে এর অনেক কুনজরই আমাদের সামনে আছে। আমেরিকান নাগরিক অধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চরিত্র, এটাই হলো প্রকৃত শিক্ষার মূল লক্ষ্য। নৈতিকতাহীন শিক্ষা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।’ আমাদের সমাজে যেন সেই পঙ্কিলতায়ই জেঁকে বসেছে। আমরা মনে করি, যে শিক্ষা মানুষকে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হতে শেখায় না, উল্টো অনৈতিকতার অপছায়া ছড়িয়ে দেয় কিংবা প্রেক্ষাপট তৈরি করে তা শিক্ষা নয়, বলা যায় এ হলো চাতুর্য মাত্র। আমাদের দেশে বিদেশিদের মেডিকেল শিক্ষা নিয়ে যা ঘটছে তা এ ছাড়া বৈ কিছু নয়। আমরা এও মনে করি, শিক্ষায় যদি অনাচারের স্পর্শ লাগে তাহলে তা সমাজকে ধ্বংসের মারণাস্ত্র হয়ে ওঠে। নৈতিক স্খলন এমনই বিপজ্জনক, যা শুধু বর্তমানকেই গ্রাস করে না, ভবিষ্যতেও ক্ষতের পরিসর বাড়ার উপসর্গ হিসেবে স্থায়ী রূপ নেয়। ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক, কবি, মধ্যযুগ-বিশেষজ্ঞ, সাহিত্য সমালোচক, সম্প্রচারক, শিক্ষাবিদ সি. এস. লিউইসের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য মনে করি। তিনি বলেছেন, ‘নৈতিকতা ছাড়া শিক্ষা মানুষকে একটি চতুর শয়তানে পরিণত করে।’ চারদিকে যখন আলোকিত মানুষের জন্য আকুতি বাড়ছে তখন যারা শিক্ষাকে ব্যবসার উপকরণ করছে তারা দেশ-জাতি তো নয়ই, সার্বিকভাবে তারা মানুষের অকল্যাণের হোতা।
আমরা মনে করি, মেডিকেল শিক্ষায় বিদেশিদের ভর্তির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের উৎসে নজর দেওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ডিগ্রি নয়, নৈতিকতাই হোক শিক্ষার মুখ্য পরিচয়। শিক্ষা যদি বাণিজ্যের স্থায়ী লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিবেক সেখানে বিকলাঙ্গ হতে বাধ্য। শিক্ষার আলোয় পরিপার্শ্ব শুদ্ধ করার প্রত্যয় দৃঢ় হোক। যেভাবে মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তির সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চলছে তা রুখে শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতির আলো প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হলে তা দেশের সুনামে আঘাত তো করবেই, পাশাপাশি ক্ষয় ও ক্ষতির চিত্র হবে আরও বহুমুখী। তা তো কাম্য হতে পারে না।