শ্রীমদ্ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী ‘যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত/অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্/পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চদুষ্কৃতাম্/ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে’ জ্ঞানযোগ (গীতা৪/৭-৮)। অর্থাৎ হে ভারত (অর্জুন), যখনই ধর্মের পতন ঘটে এবং অধর্মের বৃদ্ধি বা প্রাবল্য দেখা দেয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই। সাধু বা সৎ ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য, দুষ্কৃতকারী বা পাপীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্মকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করি।
মর্ত্যলোকে যখন ধর্মের বেশধারী অধর্মের প্রসার ত্বরান্বিত হলো, সদাচারী, নিরপরাধ মানুষের ধর্মের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে অধর্মের দিকে ধাবিত হওয়া বেগবান হলো, সমাজে দুর্বলের ওপর সবলের অন্যায় আঘাত বাড়তে থাকল, যখন ধর্মের ক্ষয় প্রবল হয়ে পড়ল, তখন ধর্ম রক্ষায় অবতাররূপে ধরাধামে আবির্ভূত হলেন যুগাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ঠিক একইভাবে যখন দুরাচারী কংস দৈববাণী শুনল যে, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’ নিজের বিনাশ নিয়ে শঙ্কিত, তখন ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির মধ্যরাতে দেবকীর গর্ভে কৃষ্ণ নামে তার অষ্টম পুত্রের জন্ম হয়। ইতিহাস বলে, শোষণকারী শিক্ষিত ব্রিটিশরা কাউকে বিশ্বাস করত না এবং তারা জানত যে, একদিন এই স্বদেশভূমি থেকে তাদের বিতাড়িত হতে হবে। মৃত্যু ভয়ে ভীত অত্যাচারী কংস দেবকীর পরপর ছয়টি সন্তানকে বধ করেছিল। দেশ রক্ষা ধর্ম রক্ষার মতো। বাংলার নবাব সিরাজউদদৌলা নিজের প্রাণ দিয়ে মাতৃভূমি রক্ষায় সমাজকে দেশপ্রেম দেখিয়েছেন; মাতৃভূমি কত বড় তার ভূমিসন্তানের কাছে।
দাপর যুগের অনাচারে যখন পৃথিবীতে অধর্মের জয়গান, ব্যভিচারে সমাজে সাধারণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তখন ধরিত্রী রক্ষায় দেবতারা প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। আশ্রয় লাভ করেন পৃথিবীর সংহারকর্তা দেবাদিদেব মহাদেবের। সবাই মিলে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের যুগসন্ধিক্ষণে পালনকর্তা বিষ্ণুর বন্দনা করেন। জনকল্যাণের হিতে, দেবতাদের আকুলতায় তুষ্ট, ভগবান দৈববাণী শুনান যে দুরাচারী কংস, জরাসন্ধ, শিশুপালসহ অত্যাচারিত রাজাদের বধ করে পাপের বিনাশ করতে মন্যুষরূপে তিনি মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হবেন শঙ্খ চক্র, গদাপদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণরূপে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পার্থিব জগতের মায়া, মোহ, ত্যাগ ও মানবপ্রেমের অমিয় বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘কর্মই ধর্ম’। তবে শ্রীমদ্ভগবদগীতার মতে, কর্ম হতে হবে নিষ্কাম, অর্থাৎ ফলের আশা না করে নিজের কর্তব্য ও ধর্ম পালন করা। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘অহংকার, রাগ ও অজ্ঞতা মানুষকে অধঃপতনের দিকে এবং আসুরিক স্বভাবের দিকে ধাবিত করে’। ষোড়শ অধ্যায় (দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ) : গীতার ১৬ নম্বর অধ্যায়ের ৪ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে দম্ভ, অহংকার, কাম, ক্রোধ ও কঠোরতা হলো আসুরিক বা দানবীয় চরিত্রের প্রকাশ, যা মানুষকে বন্ধনের দিকে টানে। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ অহংকার ত্যাগ করে সব কর্ম ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ বা আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যিনি ‘আমি’ ও ‘আমার’ এই অহংকার এবং সব আসক্তি থেকে মুক্ত হন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন। সনাতনীদের বিশ্বাস, বর্তমান কলিযুগে ধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ধর্মের লেবাসধারী মানুষের আনাগোনা দেবালয়ে বাড়বে। ধর্মের নামে দান করলেও অনেকেই নিজের প্রতিপত্তি জাহির করতে চায়, যা সব ধর্মে নিষেধ। সব ধর্ম মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়। ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। ধর্মের চেতনা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে ছোট, বড়, ধনী, গরিব সবাইকে একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর শ্রদ্ধাশীল। শান্তিপ্রিয় মানুষ চায় ধর্মের জ্ঞান, চিন্তা, চেতনা, বিজ্ঞানের আবিষ্কার জনকল্যাণের নিমিত্তে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজের সঙ্গে সমন্বিত হোক। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপ্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশিরা কখনোই ঔদার্য, পারস্পরিক শুভেচ্ছাবোধ ও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা হারায়নি। এখানে সব ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। জন্মাষ্টমীর এই শুভদিনে আমি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবার প্রতি প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’
রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটে যাওয়া অনাচারের বিচার চেয়েছে। এই সরকার গঠনে ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সমর্থন দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার পরিস্ফুরণ ঘটেছে। আমরা রাষ্ট্রের কাছে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী ও তরুণ প্রজন্মের জন্য যোগ্যতানুসারে চাকরি, লেখাপড়ার সমসুযোগ চাই। জন্মাষ্টমীর ছুটি প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম উঠে আসে। ধর্মীয় সংগঠনগুলো দুর্গাপূজার ছুটি নিয়ে আগের সরকারের কাছেও দেন দরবার করেছিল। বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালীন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালের রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বলেন, ‘সব সময় একটা ভুল ধারণা দেওয়া হয়, বিএনপির সঙ্গে হিন্দুদের নাকি দূরত্ব আছে। কিন্তু এটি ঠিক নয়। আমরা সরকারে থাকতে অনেক মন্দির সংস্কার করেছি। রমনা কালীমন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। মন্দিরভিত্তিক পাঠাগার গড়েছি।’ বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। একই সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ সরকারের কাছে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জন্মাষ্টমীর এই দিনে আমাদের প্রত্যাশা, সর্বজনের রাষ্ট্র বিনির্মাণে এ সরকার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেবে ও সবার জন্য অধিকারের জমিন সমতল করতে নির্মোহ অবস্থান নিশ্চিত করবে। সবাইকে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা। সবার কল্যাণ হোক।
লেখক : গবেষক ও পরিচালক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র। সেবায়েত, চট্টেশ্বরী কালী মন্দির।
drrajibchakraborty.com