যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মুসলিমদের ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে।
নামাজ, ধর্মীয় পোশাক, মসজিদ নির্মাণ, এমনকি বিয়ে বা বিয়েবিচ্ছেদের পরামর্শের মতো বিষয়কেও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
অধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে পুরো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি সরকারি সন্দেহকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসমা উদ্দিন এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরেছেন।
নিবন্ধে বলা হয়, টেক্সাসের সরকারি কর্মকর্তারা মুসলিমদের সাধারণ ধর্মীয় কার্যক্রমকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এর মধ্যে নামাজ আদায়, ধর্মীয় পোশাক পরা, বিয়ে বা বিয়েবিচ্ছেদ সম্পর্কে পরামর্শ এবং মসজিদ নির্মাণের বিষয়ও রয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে টেক্সাসের রেলওয়ে কমিশনার পদে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের নিয়ে চরম বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, ‘প্রতিটি মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’
২০২৫ সালের শেষের দিকে টেক্সাসের কর্মকর্তারা ডালাসের বাইরে মুসলিমবান্ধব আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিয়েবিচ্ছেদের পরামর্শ দেওয়া একটি ছোট সংগঠন নিয়েও তদন্ত শুরু করেন।
একই সময়ে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসকে টেক্সাসের আইনে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন।
২০২৬ সালের মে মাসে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট গ্র্যান্ড প্রেইরি শহরের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ওয়াটার পার্কে বেসরকারিভাবে আয়োজিত ঈদ উদযাপন বাতিল না করলে রাজ্য থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার ডলারের অর্থায়ন প্রত্যাহার করা হতে পারে। একইভাবে ডালাস ফোর্ট ওর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মুসলিমদের অজুর জন্য পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাতিল না করলে অর্থায়ন বন্ধের হুমকিও দেন তিনি।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে সন্দেহের একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে শরিয়া। সমালোচকরা প্রায়ই শরিয়াকে এমন একটি বিকল্প আইনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেন, যা একসময় মার্কিন আইনকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। অথচ নিবন্ধে বলা হয়েছে, শরিয়া মূলত বিস্তৃত ধর্মীয় ও নৈতিক নীতিমালার সমষ্টি।
আইন অধ্যাপক আসিফা কুরাইশি ল্যান্ডেসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুসলিমরা শরিয়াকে আল্লাহর নির্দেশিত পথ হিসেবে দেখেন এবং ফিকহকে সেই পথের মানবীয় ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে শরিয়ার বিভিন্ন বিধান ও প্রয়োগ নিয়ে মুসলিমদের মধ্যেও মতপার্থক্য থাকতে পারে।
এরপরও টেক্সাসের রাজনীতিকদের একটি অংশ শরিয়াকে মার্কিন আইনের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন। এর প্রভাব পড়েছে ডালাসভিত্তিক ইসলামিক ট্রাইব্যুনালের ওপরও। প্রতিষ্ঠানটি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ধর্মীয় সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ দেয়। এর অনেক মামলাই মুসলিম নারীদের বিয়েবিচ্ছেদ সংক্রান্ত, যাদের কেউ কেউ নির্যাতনমূলক দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে এই সেবা নেন।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় সালিশের এমন ব্যবস্থা শুধু মুসলিমদের মধ্যেই নেই, বরং নিউইয়র্কের ‘বেথ দিন অব আমেরিকা’ ইহুদিদের ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করে। একইভাবে মন্টানাভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ক্রিশ্চিয়ান কনসিলিয়েশন খ্রিস্টীয় নীতির আলোকে মধ্যস্থতা ও সালিশের ব্যবস্থা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালত নির্দিষ্ট শর্তে এসব সালিশি সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে। তবে মার্কিন আইনকে কোনো ধর্মীয় সালিশি বোর্ডের অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা নেই।
টেক্সাসে ইসলামিক সালিশব্যবস্থা বিশেষভাবে তদন্তের মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গভর্নর অ্যাবট ইসলামিক ট্রাইব্যুনালকে ‘আইনি আদালতের ছদ্মবেশে থাকা শরিয়া ট্রাইব্যুনাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তবে তদন্ত থেকে এখনো কোনো প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বা আইনি প্রতিষ্ঠানের আড়াল হিসেবে দেখার প্রবণতা মসজিদ নির্মাণের বিরোধেও দেখা গেছে।
২০১০ সালে টেনেসির মারফ্রিসবোরোর ইসলামিক সেন্টার নিয়ে বিরোধের সময় এর বিরোধীরা দাবি করেন, ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং এটি এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ, যার লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তখন এই দাবিকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করে।
ডালাসের উত্তরে ইস্ট প্ল্যানো ইসলামিক সেন্টার একটি মসজিদ, ইসলামিক স্কুল ও মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য আবাসন নিয়ে ৪০০ একর জমিতে প্রকল্পের পরিকল্পনা করলে সেটিও বিতর্কে পড়ে।
২০২৫ সালের মার্চে প্যাক্সটনের কার্যালয় প্রকল্পটি তদন্ত শুরু করে এবং একই বছরের ডিসেম্বরে ডেভেলপারদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
মুসলিমদের ধর্মচর্চা নিয়েও একই ধরনের সন্দেহ দেখা যাচ্ছে। টেক্সাসের ফ্রিসকোর লিবার্টি হাইস্কুলে মুসলিম শিক্ষার্থীরা ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত একটি খালি শ্রেণিকক্ষে নামাজ আদায় করতেন। পরে প্যাক্সটনের কার্যালয় স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চায়, অন্য শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে মুসলিমদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কিনা। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, কক্ষটি সব ধরনের শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত ছিল।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, নামাজের জন্য জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল এর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে। বহু বছর ধরে যে ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চলছিল, সেটিই হঠাৎ মুসলিমদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে তদন্তের বিষয় হয়ে ওঠে।
মুসলিমদের ধর্মীয় পোশাকও একই ধরনের সন্দেহের কারণ হয়ে উঠেছে। আইন অধ্যাপক সাহার আজিজের গবেষণা অনুযায়ী, ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রকাশ ক্রমেই বিদেশি পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ফলে হিজাবের মতো ধর্মীয় পোশাকও কখনো কখনো নিছক ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ হিসেবে না দেখে বিদেশি শক্তির প্রতি আনুগত্যের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মসজিদ, ধর্মীয় সালিশ, আবাসন প্রকল্প, নামাজ কিংবা পোশাক নিয়ে বিতর্কগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন প্রবণতা রয়েছে। মুসলিমরা যখন নিজেদের স্বাভাবিক ধর্মীয় জীবন প্রকাশ্যে চর্চা করেন, তখন কিছু মানুষের কাছে সেই ধর্মচর্চাই সম্ভাব্য বিপদ বলে সন্দেহ হয়।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক সন্দেহের এই ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে মুসলিমদের নিয়ে সন্দেহের প্রবণতা ৯/১১-এর আগেও ছিল। ওই হামলার পর তা আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।