পবিপ্রবির উদ্যোগে সামুদ্রিক শৈবালচাষ, উপকূলে সম্ভাবনার হাতছানি

উপকূলীয় অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা সম্প্রসারণে সামুদ্রিক শৈবাল বা সি-উইড চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং প্রাণিজ ও প্রচলিত উদ্ভিজ্জ খাদ্যের ওপর চাপ কমাতে শৈবালভিত্তিক খাদ্য ও বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) গবেষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তা থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরির উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন। তাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে এ খাতের সম্প্রসারণ ঘটানো গেলে উপকূলীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পবিপ্রবির ফিসারিজ ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীরা জানান, সামুদ্রিক শৈবাল প্রক্রিয়াজাত করে আইসক্রিম, মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট, সন্দেশ, জেলিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। জাপানি খাবার সুশির অন্যতম উপকরণ নোরি শিট তৈরিতেও শৈবাল ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া শৈবাল থেকে খাদ্য পরিপূরক, সাবান ও বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষকদের মতে, সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এসব উপাদানের পুষ্টিগত সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান অনুষদের খাদ্য অণুজীববিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহজাদুল ইসলাম বলেন, শৈবালে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও মিনারেলের পাশাপাশি প্রোটিন রয়েছে। প্রচলিত প্রাণিজ প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবে শৈবালের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। এতে আয়োডিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানও রয়েছে।

দুমকি লুথারান হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অফিসার ডা. মোনতারিয়া জান্নাত বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে এমন কিছু ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এর ব্যবহার ও গ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুষ্টিবিষয়ক নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

পবিপ্রবির মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম বলেন, পটুয়াখালী সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে সামুদ্রিক শৈবালের সম্ভাবনা রয়েছে। সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পটুয়াখালীতে শৈবাল চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পুষ্টিগুণ বিবেচনায় বিকল্প খাদ্য হিসেবে নানা ধরনের পণ্য তৈরির চেষ্টা চলছে।

একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবাল এখনো পুরোপুরি বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিকশিত হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি সামুদ্রিক সবজি হিসেবে পরিচিত। এতে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। সঠিক গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এটি পুষ্টিকর খাদ্যের একটি সম্ভাবনাময় উৎস হতে পারে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহান বলেন, সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামুদ্রিক শৈবালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি শৈবাল থেকে উৎপাদিত পণ্যের কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ উদ্যোগ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সম্প্রসারিত করা গেলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সামুদ্রিক শৈবাল উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে দেশের নীল অর্থনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।