মোজার শেখানো জাদু

রোজ একটা করে গল্প বলা এ কী কম কথা! সেই কবে থেকে টুনিকে ওর মা গল্প বলেই যাচ্ছে। বলতে বলতে সব গল্প বলা শেষ। আজ আর কোনো গল্প খুঁজে পাচ্ছে না। এদিকে গল্প না বললে টুনি ঘুমাবেও না। অগত্য কোনো উপায় না পেয়ে টুনির মা বললেন, ‘আমার ছোটবেলার একটি গল্প শুনবি?’

‘আমার গল্প হলেই চলবে, মা।’

‘বেশ! শোন তাহলে। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। বাবার সঙ্গে টেইলর কাকুর দোকানে গিয়েছি জামা বানাতে। জামার মাপ নেওয়া শেষ হলে কাকুকে বললাম, ‘কাকু, কাপড় বেশি হলে সেটা দিয়ে এক জোড়া পায়ের জামাও বানিয়ে দিও।’

টেইলর কাকু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘পায়ের জামা! সেটা আবার

কী রে?’

আমি খিলখিল করে হেসে বললাম, ‘আরে, মোজা! মোজার আসল নাম পায়ের জামা।’

পাশ থেকে বাবা হেসে বললেন, ‘ঠিকই তো বলেছে। পায়ের জন্য জামা, তাই

পায়ের জামা।’

টেইলর কাকুও হেসে ফেললেন।

বললেন, ‘আচ্ছা, তোর জন্য একেবারে জাদুর পায়ের জামা বানিয়ে দেব।’

‘তারপর! জাদুর পায়ের জামা পেয়েছিলে!’ টুনি বলল।

মা বললেন, ‘একদম কথা নয়। মন দিয়ে গল্প শোন।’

কয়েক দিন পর নতুন জামার সঙ্গে একজোড়া নরম, সুন্দর মোজাও পেলাম।

সেদিন রাতে মোজাগুলো মাথার কাছে রেখেই ঘুমালাম। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শুনতে পেলাম কে যেন ফিসফিস করে বলল, ‘টুসি... ও টুসি...’

চোখ মেলে দেখলাম, আরে! মোজা দুইটা কথা বলছে! একটা মোজা বলল, ‘আমরা কিন্তু সাধারণ মোজা নই।’

আরেকটা মোজা বলল, ‘আমরা হলাম জাদুর মোজা!’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সত্যি! তাহলে আমাকে একটা জাদু শেখাও না!’

‘কী জাদু শিখতে চাও?’

‘কাল স্কুলে ফুটবল ম্যাচ। আমি দুইটা গোল দিতে চাই।’

আমার কথা শুনে মোজা দুটো একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। একটা মোজা বলল, ‘দুইটা গোল দিতে চাও খুব ভালো কথা। কিন্তু তার আগে একটা প্রশ্ন।’

‘কী প্রশ্ন?’ আমি জানতে চাইলাম।

একটা মোজা বলল, ‘তুমি কি নিয়মিত অনুশীলন করো?’

‘উম... সব সময় না।’

‘বল পায়ে নিয়ে দৌড়ানোর অভ্যাস আছে?’

‘একটু একটু।’

‘খেলায় মনোযোগ দাও?’

‘মাঝে মাঝে।’

আমার উত্তর শুনে মোজা দুটোর একটা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তাহলে শুধু জাদু দিয়ে হবে না।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’

একটা মোজা বলল, ‘জাদু তখনই কাজ করে, যখন তার সঙ্গে চেষ্টা থাকে।’

আরেকটা মোজা বলল, ‘পরিশ্রম ছাড়া কোনো জাদুই সত্যি জাদু নয়।’

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘তাহলে তোমাদের জাদু কী?’

মোজা দুটো হেসে উত্তর দিল, ‘আমরা শুধু মনে করিয়ে দিই হাল ছেড়ো না, চেষ্টা চালিয়ে যাও।’

পরদিন সকালে আমি খুব উৎসাহ নিয়ে মাঠে গেলাম। খেলা শুরু হলো। মন দিয়ে খেলতে শুরু করলাম। বল পেলেই দৌড়াচ্ছি, পাস দিচ্ছি, আবার বল কাড়ার চেষ্টাও করছি। এক সময় সুযোগ পেলাম। ধপাস! একটা জোরালো শট দিলাম। গো-ও-ও-ল!

দর্শকরা হাততালি দিল। আমি আরও উৎসাহ পেলাম। কিছুক্ষণ পর আবার একটি গোল দিলাম। আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।

ঠিক তখনই শুনতে পেলাম, টুসি! টুসি! কী হয়েছে? চোখ খুলে দেখলাম, নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। মা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অবাক হয়ে চারদিকে তাকালাম। না, মাঠ নেই। খেলা নেই। গোলও নেই। সবই ছিল স্বপ্ন! কিন্তু বিছানার পাশে রাখা নতুন মোজা দুটির দিকে তাকিয়ে আমার মুখে হাসি ফুটল। মোজাগুলো হাতে নিয়ে বললাম, বুঝেছি। আসল জাদু তোমাদের ভেতরে নয়। মনে হলো মোজা দুটোও যেন মুচকি হাসছে। তারপর ওদের বললাম, আসল জাদু হলো চেষ্টা, অনুশীলন আর নিজের ওপর বিশ্বাস।

তারপর থেকে আমি নিয়মিত অনুশীলন করতে লাগলাম। আর যখনই নতুন কোনো কাজ কঠিন মনে হতো, মোজা দুটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলতাম, জাদু কোথাও লুকিয়ে নেই। আসল জাদু আমাদের চেষ্টার মধ্যেই আছে।

আমার কথাটি ফুরোল নটে গাছটি মুড়োল।

মায়ের কথা শেষ হতেই টুনি একটু ভেবে বলল, ‘তাহলে জাদুর মোজা সত্যিই ছিল না?’

মা তার কপালে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না। কিন্তু মোজা দু’টি আমাকে একটা খুব বড় জাদু শিখিয়েছিল।’

‘কী জাদু, মা?’

‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার জাদু। ওটাই আসল জাদু।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই টুনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

ঘুমানোর আগে মাকে বলেছিল, ‘তাহলে আমি কাল থেকে সাইকেল চালানোর অনুশীলন করব। পড়ে গেলেও ভয় পাবো না।’

এই কথাটা মনে করে টুনির মা টুসি টুনির ঘুমন্ত মুখের ওপর হাত বুলিয়ে বললেন, ‘এই তো আমার সাহসী মেয়ে।’