কাজী নজরুল ইসলামের নাম প্রথম জানি ‘ভোর হলো দোর খোলো, খুকুমণি ওঠো রে!’ কবিতার মাধ্যমে। এরপর বাবার মুখে জেনেছি, তিনি আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি। কিন্তু যেদিন বাবা নজরুল ইনস্টিটিউট প্রকাশিত পিকটোরিয়াল বায়োগ্রাফি ‘কাজী নজরুল ইসলাম : দ্য রেবেল পয়েট’ বইটি বাসায় এনে দিলেন, সেদিন যেন আমার সামনে নজরুলের এক নতুন দুনিয়া খুলে গেল।
বইটিতে নজরুলের আট পুরুষের ঊর্ধ্বতন এবং পাঁচ পুরুষের অধস্তন বংশপরিচয়ের একটি ফ্যামিলি ট্রি ছিল। সবার ওপরে ছিল সুফি মোহাম্মদ ইসলামের নাম। তিনি নজরুলের কী হতেন, এই ভাবনাটি আমাকে অনেক দিন তাড়া করেছে। নজরুলের গান লেখার খাতাটিও দেখেছি সেই বইয়ে। দেখেছি তার নিজের হাতের লেখাও।
সেখানে আমি দেখতে পাই, যে ঘরটিতে নজরুল জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই ঘরটিও। চুরুলিয়া গ্রামের একটি মাটির ঘর। ঘরের ওপর ছনের ছাউনি। যে স্কুলে তিনি পড়তেন, সেই স্কুলটিও দেখি। মাটির দেয়ালে একটি দুটি ইট! যে মসজিদে ইমামতি করতেন, সেটিও দেখি। এমনকি যে টালির তৈরি বেকারিতে কাজ করতেন, সেটিও দেখতে পাই বইটির ছবিতে।
১৭ বছর বয়সে নজরুল দেখতে কেমন ছিলেন, সেই ধারণাটাও পাই ওই বই থেকেই। এরপর ২৪, ২৬, ২৭ বছর বয়সের কত ছবি! কোন ছবিটা নেই সেখানে? ফেজ মাথায় কেমন দেখায় নজরুলকে, কিংবা শিরস্ত্রাণ পরলে কেমন দেখায়, সবই যেন আমার মুখস্থ।
নজরুল ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস এবং ‘দারিদ্র্য’সহ অসংখ্য কবিতা যে আমগাছের নিচে বসে লিখেছেন, সেই গাছটিও দেখি। কাজী নজরুলের যে ক্রাইসলার গাড়ি ছিল সেটা কি জানো? কালো রঙের, ছাদখোলা! নজরুলের ছেলে বুলবুলের শৈশবের সেই ছবিটি দেখে কী যে মায়া হয়েছিল আমার!
সবাই যখন পড়ে, ‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত’, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নজরুলের হাবিলদারের সেই ছবি, তার সৈনিক জীবনের সেই ছবি। কিংবা তোমরা যখন পড়ো, ‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে!’, তখন আমার চোখে ভেসে ওঠে কবির শেষ জীবনের সেই ছবি, তার চিরবিদায়ের মুহূর্ত।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কবির নামাজে জানাজায় সেসময়ের সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান দাঁড়িয়েছিলেন কবির মরদেহের পেছনে। কবিকে শেষবার দেখতে আসা বিশাল জনতার সেই দৃশ্যটিও ভুলতে পারি না।
এভাবেই কবিকে ঘিরে নানা ছবি, নানা মুহূর্ত আমার মনে এক আলাদা নজরুল-দুনিয়া তৈরি করেছে। আমার সেই দুনিয়া তৈরি হয়েছিল শৈশবেই। তখন থেকেই কবি নজরুল আমার প্রিয় হয়ে ওঠেন।
এভাবেই আমি শুধু নজরুলের কবিতা পড়ি না, দেখতেও পাই!