সালমান শাহর জনপ্রিয়তা যে কারণে বাড়ছে

সালমান শাহ নেই, আছেন দর্শকের স্মৃতিতে এবং সবচেয়ে বেশি যেন বেঁচে আছেন তার সিনেমার গানগুলোতে। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে যে সংখ্যক গান দর্শকের মুখে মুখে ফিরেছে, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল। নব্বইয়ের দশকের সেই তরুণ নায়কের সঙ্গে প্রেম, বিরহ, আনন্দ, অভিমান কিংবা নিঃসঙ্গতার যে গানগুলো জড়িয়ে আছে, তিন দশক পরও সেগুলোর আবেদন কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে গানগুলো ফিরে আসছে নতুন পরিবেশনা ও নতুন কণ্ঠে।

সালমান শাহর চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার অকালমৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অভিনয় করেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। কিন্তু তার সিনেমার গানের জনপ্রিয়তা সেই সংখ্যার তুলনায় বিস্ময়করভাবে বড়।

‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘তোমাকে চাই’, ‘তুমি আমার’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ কিংবা ‘আনন্দ অশ্রু’ প্রায় প্রতিটি ছবির গানই যেন আলাদা করে দর্শকের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ছবির গানগুলো নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল; ‘এইদিন সেইদিন কোনো দিন’, ‘নীল সাগর পার হয়ে’ এবং ‘ও সাথীরে, যেও না কখনো দূরে’ দর্শক হৃদয়ে গেঁথে আছে।

সালমান শাহ-শাবনূর জুটির অন্যতম স্মরণীয় গান ‘সাথী তুমি আমার জীবনে’। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ ছবির এই গানের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। কণ্ঠ দিয়েছেন খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপা। গানটির জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া।

‘তুমি আমার’ ছবির ‘জ¦ালাইয়া প্রেমের বাত্তি’ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল সালমান শাহ ও শাবনূরের প্রথম জুটিবদ্ধ চলচ্চিত্র। গানটির গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির এবং সুরকার আবু তাহের। কুমার বিশ্বজিৎ ও রুনা লায়লার কণ্ঠে গানটি দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছবির দৃশ্যে সালমান-শাবনূরের রসায়ন গানটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।

এ ছবির গানগুলোর বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘আমার জন্ম তোমার জন্য’, ‘দেখা না হলে একদিন’, ‘তুমি আমার ভালোবাসা গান’ এসব গানও সমাদৃত। গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন শেখ ইশতিয়াক, কনকচাঁপা, আগুন ও কুমার বিশ্বজিতের মতো শিল্পীরা।

‘জীবন সংসার’ ছবির ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু’ গানটিও সালমান শাহর গানের তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গানটিতে কণ্ঠ দেন আগুন ও সাবিনা ইয়াসমিন; পর্দায় সালমান শাহ ও শাবনূর। গানটির আবেদন প্রায় তিন দশক ধরে সমান।

১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সালমানের আরেক সুপার হিট সিনেমা ‘তোমাকে চাই’। সিনেমায় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর

কথায় ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি কালজয়ী। সংগীতায়োজন করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। এই সিনেমার প্রায় সব গানই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘তুমি আমায় করতে সুখী জীবনে’ গানটিও যেন শ্রোতার জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে, তেমনি কনকচাঁপার কণ্ঠে ‘আমার নাকেরই ফুল বলে রে তুমি যে আমার’ গানের সঙ্গে সালমান-শাবনূরের রসায়ন দর্শক চোখে আজও লেগে আছে।

‘আনন্দ অশ্রু’ যেন সালমানের মিউজিক্যাল ফিল্ম! ছবিটি ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায়, অর্থাৎ সালমান শাহর মৃত্যুর পর। সংগীত ও গানের কথা লিখেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’ গানটি শুনলে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। সালমান হারানোর বেদনায় এলোমেলো হয়ে যায় শ্রোতা। এই গানটির দুটি ভার্সনে কণ্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর, সালমা জাহান ও কনকচাঁপা। ‘তুমি আমার এমনই একজন’ গানটি গেয়েছেন কনকচাঁপা।

সালমান শাহর গানের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ ছিল শক্তিশালী গীতিকার ও সুরকারদের সমাবেশ। আলম খান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মনিরুজ্জামান মনির, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলসহ সে সময়ের প্রতিষ্ঠিত সংগীত স্রষ্টারা তার চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সালমান শাহর সিনেমার গানগুলো নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব করে। গীতিকারদের শব্দ, সুরকারদের সুর, কণ্ঠশিল্পীদের আবেগ এবং পর্দায় সালমান শাহর অভিনয় সব মিলেই তৈরি হয়েছিল একেকটি কালজয়ী গান।

একজন নায়কের সিনেমার এত গান দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয় থাকা সত্যিই বিরল। সালমান শাহর ক্ষেত্রে তার মৃত্যু শিল্পী-অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। তার সিনেমা হয়তো সময়ের সঙ্গে পুরনো হবে, কিন্তু গানগুলো দিন দিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে। রেডিও, ক্যাসেট, সিডি, বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সময় বদলেছে, নতুন শ্রোতা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমেও গানগুলোর মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ।

পর্দার নায়ককে একদিন থেমে যেতেই হতো, কিন্তু গানের নায়ক থামেননি, বারবার ফিরে আসে সেই হাসিমুখ, সেই তারুণ্য, সেই প্রেমিক চরিত্রের সালমান। এখানে সালমান শাহ চিরকালীন।