দেশের এক নম্বর ব্যাংক হবে প্রিমিয়ার ব্যাংক

দেশের তৃতীয় প্রজন্মের পুরস্কারপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালের ১০ জুন। গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন, আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকটি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। ২০২৫ সালের আগস্টে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হন মুক্তিযোদ্ধা ডা. আরিফুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ, যা বর্তমানে ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ‘দেশ রূপান্তর’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন চেয়ারম্যান ডা. আরিফুর রহমান।

প্রশ্ন : আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন এক বছর হয়। এই সময়ে কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে?

উত্তর : দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করি। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ। বর্তমানে তা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে তা ২০ শতাংশে আনার লক্ষ্য রয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ব্যাংককে আরও শক্তিশালী ও টেকসই অবস্থানে নেওয়ার কাজ চলছে।

প্রশ্ন : ডিসেম্বরের মধ্যে ২০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

উত্তর : এজন্য নিয়মিত ঋণ আদায় জোরদার, বড় খেলাপিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে পুনঃতফসিল, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

প্রশ্ন : ব্যাংক খাতে অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপ ও সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকে এই প্রবণতা আছে?

উত্তর : সুশাসনই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। পরিচালনা পর্ষদ আইন, নীতিমালা অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অডিটসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে। পর্ষদ নীতিনির্ধারণ করবে এবং ব্যবস্থাপনা সেটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে এটাই আমাদের অবস্থান।

প্রশ্ন : ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে আপনার অগ্রাধিকার কী?

উত্তর : আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেন তাদের সঞ্চয় নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তায় না থাকেন, সে জন্য কার্যকর আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুশাসন, জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। এতে গ্রাহকের আস্থা বাড়বে, অর্থনীতিও আরও স্থিতিশীল হবে।

প্রশ্ন : মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে, এমতাবস্থায় আমানতের মুনাফা নির্ধারণে ব্যাংকগুলোর কী করা উচিত?

উত্তর : মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের মুনাফা কম হলে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা ব্যাংকের বদলে বিকল্প বিনিয়োগের দিকে যেতে পারেন। তাই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমানতের মুনাফার হার নির্ধারণ করা জরুরি।

প্রশ্ন : পর্ষদে আপনার হস্তক্ষেপ নেই, এটা গ্রাহক বুঝবে কীভাবে?

উত্তর : এটি বোঝার উপায় হলো পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, স্বচ্ছতা ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা থেকেই এটা প্রতিফলিত হয়। বর্তমান পর্ষদ নীতিমালা, আইন ও সুশাসনের ভিত্তিতে কাজ করছে। ফলে অতীতের সঙ্গে তুলনা করলেই গ্রাহক পরিবর্তনটি উপলব্ধি করতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্বের মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করা।

প্রশ্ন : করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে কাজ করছে?

উত্তর : সবার আগে সুশাসন দরকার। করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিতে সবার আগে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে পুরো ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতে সুশাসনের ভিত্তি আরও মজবুত হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদকে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালনে দক্ষ হতে হবে এবং ব্যবস্থাপনাকে সেই নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন : নগদবিহীন লেনদেন বাড়াতে ‘বাংলা কিউআর’কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

উত্তর : ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহকরা সহজে ও নিরাপদে লেনদেন করতে পারবেন। এর ফলে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে, লেনদেনের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং অর্থ পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপচয়ও হ্রাস পাবে। তাই আমরা ‘বাংলা কিউআর’-এর বিস্তার ও কার্যকর ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

প্রশ্ন : ডিজিটাল ব্যাংকিং ও সাইবার নিরাপত্তায় ব্যাংকের বর্তমান প্রস্তুতি কেমন?

উত্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন এ খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ, দ্রুত ও সহজ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে আমরা আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট, সার্বক্ষণিক মনিটরিং, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, ডেটা এনক্রিপশন ও কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন : দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনার মতে সবচেয়ে জরুরি সংস্কার কী? 

উত্তর : দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে জরুরি সংস্কার হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে খেলাপি ঋণ কমবে, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং গ্রাহকদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক তদারকি আরও কার্যকর করা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : নতুন গ্রাহকরা আপনার ব্যাংকে আসবে কেন?

উত্তর : প্রিমিয়ার ব্যাংক তার পণ্য ও সেবার গুণমানের বিষয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণ। ব্যাংকে একদল মেধাবী কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা নতুন উদ্ভাবনী পণ্য এবং সেবা দিতে সক্ষম। সর্বোপরি ব্যাংকের দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ সুশাসনে কাজ করছে। আমাদের শক্তিশালী মূলধন ও  লিকুইডিটির পর্যাপ্ততা আছে, যা গ্রাহক পর্যায়ে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সাসটেইনিবিলিটির বিষয়ে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। গ্রাহকদের জন্য ট্রেড অপারেশন অটোমেশন করা, করপোরেট ব্যাংকিংয়ে নতুন নতুন সেবার সংযোজন করা, ব্যাংকের গ্রাহক সেবার মান উন্নয়ন নিরাপদ ও নির্ভুল সেবার নিশ্চয়তার বিভিন্ন ধরনের সেবা চালু রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যাংকই গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারেনি। সেখানে প্রিমিয়ার ব্যাংক ব্যাংকের গ্রাহকরা তাদের চাহিদামতো টাকা তুলতে পেরেছে। ফলে গ্রাহকের আস্থা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার কারণে ব্যাংকটির আমানত, হিসাবধারীর সংখ্যা, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও খেলাপি ঋণ আদায়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অগ্রগতি হয়েছে। সঠিক নেতৃত্ব, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে প্রিমিয়ার ব্যাংক দেশের আরও গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে পরিণত হবে।

প্রশ্ন : ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই?

উত্তর : গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক শক্তিশালী করাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। দেশের এক নম্বর ব্যাংক হবে প্রিমিয়ার ব্যাংক, সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। আমাদের ব্যাংকিং সেবাকে ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড’-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দিকে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে যার যত ডিজিটাল সক্ষমতা বেশি, সেই ব্যাংকই তত বেশি এগিয়ে যাচ্ছে। ‘পি মানি’  নামে একটি অ্যাপস রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের। সেই অ্যাপসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণের মানোন্নয়ন ও আদায় কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি কমানো এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করার পরিকল্পনা রয়েছে।