সুরসম্রাটের সান্নিধ্যে

১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ঢাকায় এসেছিলেন। উঠেছিলেন বুড়িগঙ্গার তীরে লাল কুটিরের পাশের বাড়িতে। বড় ভাই প্রখ্যাত সুরকার আবদুল আহাদের কাছে শুনলেন সে খবর। পর দিন সকালে সেজ বোন মমতাজ খানমকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় করে হাজির হলেন সেই বাড়িতে। বাইরের ঘরে উজ্জ্বল বর্ণের ছোটখাটো মানুষটি নদীপাড়ের একদল গরিব ছেলেমেয়েকে বেহালা বাজিয়ে শোনাচ্ছেন। রাজদরবারে যার স্থান, তিনি বসে আছেন মাটিতে এই দৃশ্য দেখে আলোকচিত্রী সাইদা খানমের মাথাটা শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে। দুদিন পর বেতারের এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সরোদ বাজিয়ে শোনান আলাউদ্দিন খাঁ। মধ্যরাত পর্যন্ত চলে ঘোরলাগা জলসা। সাইদা খানম সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে। সে রাতে কী যে বাজিয়েছিলেন, সাইদা খানমের সারাজীবনে সেই সুরের ঘোর কাটেনি।

এরপর দুই-তিনবার ঢাকায় এসেছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ। ঢাকায় এসে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে উঠতেন বর্ধমান হাউজে [বর্তমানে বাংলা একাডেমি]। অল্প কয়েক দিন থাকতেন। সাইদা খানম ‘সাপ্তাহিক বেগম’ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিদিন সকালে সুরসম্রাটের কাছে যেতেন। ফরাস পাতা ঘরে তাকে ঘিরে থাকতেন শিল্পী, সাহিত্যিক আর গুণী মানুষেরা। ফরাসের একপাশে চুপ করে বসে থেকে তিনি তাদের কথাবার্তার কিছু অংশ টুকে রাখতেন। তিনি আলাউদ্দিন খাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। ‘সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’ শিরোনামে সেই সাক্ষাৎকার ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে কয়েক পর্বে ছাপা হয় বেগম পত্রিকায়।

আলাউদ্দিন খাঁ শুরু থেকেই সাইদা খানমকে ভীষণ স্নেহের চোখে দেখতেন। তিনি তাকে সরোদ শেখানোর জন্য মাইহারেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে সংগীত সাধনা করার মতো তার শক্তি ছিল না। তাই সেই সৌভাগ্য গ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সাইদা খানমের সঙ্গে পারিবারিক গল্পও করতেন আলাউদ্দিন খাঁ, বিশেষ করে স্ত্রী মদিনা বিবির।

সাইদা খানম তখন থাকতেন বকশীবাজার এলাকার ১০ নম্বর জয়নাগ রোডের একটি বাড়িতে। তিনি আলাউদ্দিন খাঁকে সেই বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানালেন। আলাউদ্দিন খাঁ তার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। সুরসম্রাটের আগমনের খবরে তার খালা কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা অনেক রকম খাবার তৈরি করেন। কিন্তু বৃষ্টি বড় ঝামেলা বাধালো। সকাল থেকে টানা বৃষ্টি। পথঘাট সব ডুবে গেল। রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই। বাসায় টেলিফোনও নেই যে তিনি ফোন করে পরিস্থিতির কথা জানাবেন।

সাইদা খানম পর দিন সকালে টিফিনকারী ভরে খাবার-দাবার নিয়ে হাজির হলেন বর্ধমান হাউজে। আলাউদ্দিন খাঁকে যিনি দেখাশোনা করেন তিনি সাইদা খানমকে বললেন, ‘আপনি এখনই চলে যান। ওস্তাদজী আপনার ওপর ভীষণ রেগে আছেন। আপনাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য তিনি তৈরি হয়ে পায়চারি করছিলেন।’ শুনে নিজেকে অপরাধী লাগে। খাবারগুলো টেবিলে রাখতেই ভদ্রলোক বললেন, ‘এগুলো নিয়ে যান। নইলে ছুড়ে ফেলে দেবেন।’ পথ যে নদী হয়ে গিয়েছিল সে কথাও বলতে পারলেন না ১৮ বছর বয়সী সাইদা খানম। অশ্রুসিক্ত চোখে বর্ধমান হাউজ থেকে রাস্তায় বেরিয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন আর কোনো দিন আলাউদ্দিন খাঁর ছবি তুলতে বা সাক্ষাৎকার নিতে আসবেন না।

বছরখানেক পরের ঘটনা। সন্ধ্যার দিকে বন্ধুবান্ধবসহ কলকাতার গড়ের মাঠে ঘুরছিলেন। হঠাৎ দেখলেন বিশাল প্যান্ডেল; বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে। শুনলেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ রাতে সরোদ বাজাবেন। শুনে আগের সব প্রতিজ্ঞা ভুলে গেলেন। ভাবলেন ভেতরে গিয়ে দেখি। যদি দেখা করেন তাহলে ওই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবেন। ভেতরে গিয়ে একটা সিøপ পাঠালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে এলেন আলাউদ্দিন খাঁ! সালাম দিতেই তিনি সাইদা খানমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ওই দিনের ঘটনার পর ভাবতাম আর বোধহয় কখনো দেখা হবে না।’ এত বড় মানুষের মুখ থেকে এমন কথা শুনে তার চোখ ছলছলিয়ে ওঠে। এসব কথা সাইদা খানম রচিত ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’ বইয়ে বিদৃত আছে।

সাইদা খানমকে তিনটি চিঠি লেখেন আলাউদ্দিন খাঁ। চিঠিগুলো তিনি পরম যতœ করে রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে সাইদা খানমের শেষ দেখা কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে, ছেলে আলী আকবরের বাসায়। আলাউদ্দিন খাঁর বয়স তখন ১০৯। বয়সের ভারে তিনি তখন খুবই ক্লান্ত। সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকেন। সাইদা খানমকে দেখে তিনি ভীষণ খুশি হলেন। অনেকক্ষণ গল্প করলেন। জানালেন, সংগীতের মধ্য দিয়ে তিনি আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ সাধন করেন। গল্প করতে করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। দুপুরের খাবার না খাইয়ে সাইদা খানমকে ছাড়লেন না। এরপর যতদিন গেছেন তাকে আহারে সঙ্গ দিতে হয়েছে।

আলাউদ্দিন খাঁর একমাত্র মেয়ে অন্নপূর্ণা। তিনি তার বয়োবৃদ্ধ পিতাকে দেখাশোনা করতেন। আলাউদ্দিন খাঁ যখন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন, তখন তিনি তার বাবার স্কুলটা দেখাশোনা করতেন। অন্নপূর্ণাকে সাইদা খানমের মারাঠি মেয়েদের মতো মনে হতো। পরিচয়ের শুরুতেই তিনি শর্ত দেন যেন ছবি না তোলা হয়। সংগীত জগতে অসাধারণ প্রতিভা থাকার পরও জনসম্মুখে তিনি কখনো বাজাননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি তার স্বামী প-িত রবিশঙ্করের চেয়েও সংগীত প্রতিভায় অগ্রগামী ছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ বুঝেছিলেন, মেয়ে শুরু করলে জামাতাকে ছাড়িয়ে যাবেন। সে জন্যই তিনি অন্নপূর্ণাকে সামনে আসার অনুমতি দেননি। অন্নপূর্ণাও পিতার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন।

সাইদা খানম প্রায় অন্নপূর্ণাকে বলতেন ‘আপনার বাজনা শোনার সৌভাগ্য কী আমার হবে?’ অন্নপূর্ণা কিছু বলতেন না। চলে আসার আগের দিন সাইদা খানম বিদায় নিতে গেলেন আলাউদ্দিন খাঁর কাছে। তিনি প্রাণভরে দোয়া করলেন। চলে আসার সময় অন্নপূর্ণা সদয় হলেন। তিনি সাইদা খানমকে নিয়ে গেলেন তার ফ্ল্যাটে। কাজের লোক ছাড়া ওই ফ্ল্যাটে আর কেউ নেই। ড্রয়িংরুমের পরিবেশ দেখে বোঝা গেল তিনি নিয়মিত রেওয়াজ করেন। তিনি সাইদা খানমকে ড্রয়িংরুমের ফরাসে বসিয়ে সেতারে হাত রাখলেন। আধা ঘণ্টার বেশি বাজিয়ে চলছেন। মনে হচ্ছে, সুর নয়, যেন জাদুমন্ত্র! অপূর্ব মূর্ছনায় কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন সাইদা খানম। সেতার থামতেই দেখেন তার চোখে পানি!

চা খেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অন্নপূর্ণা বললেন, ‘আপনি যদি কাউকে বলেন অন্নপূর্ণা আপনাকে সেতার বাজিয়ে শুনিয়েছে, তাহলে সে ভাববে আপনি চাল মারছেন।’ সুরের রেশ নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অন্নপূর্ণার জন্য সাইদা খানমের মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল।