শামা ওবায়েদ বললেন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপ তৈরির সুযোগ কাজে লাগাতে চায় সরকার

রোহিঙ্গা সমস্যা আদতে আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, এ সমস্যা নিরসনে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করার সুযোগ কাজে লাগাবে সরকার। এ ছাড়া, বাংলাদেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পেতে প্রচারণা চালানো হবে।

রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে গতকাল শনিবার সেন্টার ফর নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশি আয়োজিত ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। সভায় সেন্টার ফর নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারপারসন এম এস সেকিল চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন।

সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, এবারের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক সংহতিকে পুনরুজ্জীবিত করার বৈশ্বিক থিম বা স্লোগান নিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সুরাহা না হওয়া বিষয় ও দেশগুলোর দাবি-দাওয়া নিয়ে সাধারণ পরিষদে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর। এবারের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আওতায় দেশের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে আঞ্চলিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে অনেকগুলো দেশ ও পক্ষ জড়িত হয়ে পড়েছে। ফলে, আদতে সমস্যাটি আরও ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে এই সমস্যার সুরাহা করা কঠিন হয়ে পড়বে।’ তিনি জানান, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও এবার ইউএনজিএ-তে একটা সেশন হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু বর্ডারের ওই পারে মিয়ানমার সরকার, আরকান আর্মি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত, বিভিন্ন দেশের ওখানে স্টেক আছে; সেই জায়গাটা চিন্তা করে আমাদের রিজিওনাল যেই কমপ্লিকেশনটা তৈরি হয়েছে ওখানে, সেখানে কিন্তু আন্তর্জাতিক একটা চাপ না হলে এই সমস্যা সমাধান করা খুবই ডিফিকাল্ট হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘সেই জায়গাটাতেও কিন্তু আমি মনে করি, আপনাদের যার যার জায়গা থেকে; যে যেখানে আছেন, আপনাদের একটা ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। ’

এবারে বাংলাদেশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের অধিবেশনকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এবারে এক ধাপ এগিয়ে একটি মাত্রা যোগ হয়েছে, যা আপনারা সবাই বলেছেন যে, এটা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা, নতুন আকাক্সক্ষা। একটা দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরেছি। এই বার্তা আমরা দিতে চাই। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের যে গল্পটা আমরা এখানে করছি, সেটা কীভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা যায়, সেটার একটা বিশাল সুযোগ আমরা হয়তো পাব। আমাদের উন্নয়নের অধিকার ঘোষণার চার দশক, ডারবান ঘোষণার রৌপ্যজয়ন্তী, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিমারী প্রতিরোধ ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়ে আলোচনা হবে।’

তিনি বলেন, ‘যেখানে আমাদের জাতীয় স্বার্থ গুরুত্ব পাবে, বাংলাদেশের কী কী সম্ভাবনা আছে সেগুলো গুরুত্ব পাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি কীভাবে হতে পারে সেটা গুরুত্ব পাবে। সবকিছু মিলেই এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশিদের জন্য এদেশে বিনিয়োগের পথ সুগম করতে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের বার্তা তুলে ধরা হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে। আমাদের বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে শিল্পক্ষেত্রে কাজে লাগাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমরা আহ্বান জানাব।

তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস খুঁজছে। এজন্য সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করা যায় তাও সরকারের কর্মপরিধিতে রয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, সে জন্যই ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আদলে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্ট’ নামে একটি আইন পাস হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন ১০ জায়গায় ঘুরে বেড়াতে না হয় এবং এক পয়েন্ট থেকেই প্রয়োজনীয় সব সুবিধা পান, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি বা অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পাটকে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সম্পদ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবেশবান্ধব ও বায়োডিগ্রেডেবল ফাইবার হিসেবে পাট ও পাটজাত পণ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চায় সরকার। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি, কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু সমস্যার দেশ নয়, বাংলাদেশ সম্ভাবনার দেশ। পর্যটন, ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সুযোগ রয়েছে দেশে। সরকার একা সব পরিবর্তন করতে পারবে না। বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে একটি আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে তুলে ধরতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আলোচনার শুরুতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নবনিযুক্ত নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, ইউএনজিএতে যেহেতু এবার সভাপতিত্ব করবে বাংলাদেশ; তাই জলবায়ু তহবিলের অর্থ পেতে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান নিতে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কার্বন ট্রেড করে সুবিধা নেয় এক দেশ আর দুর্ভোগ পোহাতে হয় অন্য দেশকে। আমাদের উপকুলের মানুষ এ জন্য ভীষণ রকমের ক্ষতির শিকার হয়ে চলেছে। অথচ, কার্বন নিঃসরণ করা দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থ আমাদের দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ডব্লিউটিও মূলত অচল হয়ে পড়েছে। এখন দেশগুলো আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির বার্তা দিতে হবে। প্রয়োজনে আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে ঢুকতে হবে। মোট কথা, অর্থনীতি হতে হবে আমাদের অগ্রাধিকার।

গুম কমিশনের সদস্য নুর খান লিটন বলেন, পুরো পৃথিবীকে এই বার্তা দিতে হবে যে, আমরা একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন ছিলাম। এখন আমরা কথা বলতে পারছি। আমরা জাতিসংঘ গুম নিরোধসংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষর করেছি। এখন জাতীয় সংসদে এটা অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে।

সভায় বক্তারা দেশের ঐতিহ্যবাহী মসলিনসহ কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা দিয়ে দেশের ইতিবাচক সূচকগুলো তুলে ধরে একটি গোছানো, পরিপাটি গল্প জাতিসংঘে তুলে ধরতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।