ঝুঁকিতে মেরিন ড্রাইভ সড়ক

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত জিওব্যাগ ও জিওটিউব বাঁধ ভেঙে বিলীন হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। সাগরের অস্বাভাবিক জোয়ার আর উত্তাল ঢেউয়ের একের পর এক আঘাতে সড়কটির টেকনাফ অংশে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই সড়কের বেশ কিছু অংশ ধসে পড়েছে, যা দৃষ্টিনন্দন এই পর্যটন মহাসড়কের অস্তিত্বকে চরম সংকটে ফেলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে সাগরের জোয়ারের তোড়ে সড়কটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে টেকনাফের সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে।

সরেজমিন টেকনাফের সাবরাং, মুন্ডার ডেইল ও বাহারছড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাগরের স্বাভাবিকের চেয়ে ৪-৫ ফুট উচ্চতার জোয়ারের ঢেউ সরাসরি এসে মেরিন ড্রাইভের তলদেশে আছড়ে পড়ছে। ঢেউয়ের তীব্রতায় সুরক্ষার জন্য সাময়িকভাবে বসানো জিওব্যাগগুলো ফেটে বালু ধুয়ে যাচ্ছে এবং মাটির বাঁধ ধসে পড়ছে। সড়কের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই ধসে পড়ায় পূর্ব পাশের ফসলি জমি এবং লোকালয়ে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বসতভিটা সরাসরি ভাঙন এবং প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত, আতঙ্কে পথচারী ও চালকরা : সড়ক ধসে পড়ার কারণে বর্তমানে এক লেনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চলাচল করছে। ভাঙনকবলিত অংশ পার হওয়ার সময় স্থানীয় পথচারী করিম উল্লাহ বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন আমাদের যাতায়াত করতে হয়। এখন জোয়ারের সময় রাস্তা দিয়ে হাঁটাও ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাগরের ঢেউ এসে সরাসরি রাস্তার ওপর আছড়ে পড়ছে। নিচের মাটি সরে যাওয়ায় রাস্তাটা কাঁপতে থাকে। দ্রুত এটা ঠিক না করলে যেকোনো সময় পুরো রাস্তা সাগরে চলে যাবে।’ মোটরসাইকেল আরোহী ও পর্যটক ফাহিম আহমেদ বলেন, ‘কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাচ্ছিলাম, কিন্তু এখানে এসে দেখি রাস্তার অর্ধেকটাই ভেঙে গেছে। দূর থেকে হুট করে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সামনের রাস্তা ভাঙা। বিশেষ করে রাতের বেলা এই রাস্তায় চলাচল করা এখন মৃত্যুফাঁদের মতো।’

ইজিবাইক (টমটম) চালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রাস্তা ছোট হয়ে যাওয়ায় বিপরীত দিক থেকে বড় গাড়ি এলে সাইড দেওয়ার জায়গা থাকে না। ভাঙা অংশের ওপর দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় চাকা পিছলে নিচের দিকে চলে যাওয়ার ভয় থাকে।’ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বাসিন্দারা এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাবরাং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সেলিম বলেন, ‘সাগরের ঢেউ যেভাবে বাঁধের ক্ষতি করছে, তাতে আমরা অত্যন্ত আতঙ্কে আছি। জিওব্যাগ দিয়ে সাময়িক প্রতিরোধ করা হলেও তা তীব্র জোয়ারের সামনে টিকছে না। যদি এই মেরিন ড্রাইভ সড়কটি পুরোপুরি ভেঙে যায়, তবে আমাদের ঘরবাড়ি সাগরে বিলীন হয়ে যাবে। এখানকার প্রায় দুই হাজারেরও বেশি পরিবার এখন ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে।’

কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কর্মকর্তা এবং মেরিন ড্রাইভের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের (ইসিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাগরের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। এছাড়া সৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সড়কের তলদেশ দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

স্থায়ীদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা বা দুর্যোগের মৌসুমে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অস্থায়ীভাবে জিও-ব্যাগ ফেলা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো কাজে আসছে না। টেকনাফের অর্থনীতি, পর্যটন শিল্প এবং উপকূলীয় মানুষের জানমাল রক্ষার্থে মেরিন ড্রাইভের পশ্চিম পাশে দ্রুত একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী গাইডওয়াল বা সিসি ব্লকের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনীক চৌধুরী বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভ সড়কের কয়েকটি পয়েন্টে জোয়ারের পানিতে ভাঙনের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। যেখানেই বাঁধ দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানেই জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন করে জিও-ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসনকে সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য এখানে একটি স্থায়ী এবং পাথরে সিসি ব্লক বা আধুনিক টেকসই প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন, যার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।’