ধানক্ষেতেই বিষের কারখানা!

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ও প্রশাসনিক ছাড়পত্র ছাড়াই ফসলি জমিতে ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে দু’টি অবৈধ সিসা তৈরির কারখানা। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছয়ায় পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির এই কর্মকাণ্ডে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য এবং একই সঙ্গে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের নিঘোরকান্দা এলাকার ইটভাটার পাশে ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে আজাদ নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অবৈধ কারখানা স্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, বৈলর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে একইভাবে গড়ে তোলা হয়েছে আরও একটি কারখানা। 

সরজমিনে দেখা যায়, এসব কারখানায় প্রায় অর্ধশত শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। দিনের বেলায় তারা পুরোনো ব্যাটারি কেটে সিসা ও প্লাস্টিক আলাদা করেন, আর রাতের আঁধারে মাটির গর্তে তা পুড়িয়ে ঘন পাত্রের আকার দেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কোম্পানিতে বিক্রি করা হয়। ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট অ্যাসিডের তীব্র ঝাঁজালো গন্ধে পুরো এলাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি বা ট্রেড লাইসেন্স নেই। হরিরামপুর ইউনিয়নের নিঘোরকান্দা এলাকার বাসিন্দা নাহিদ জানান, ব্যাটারি ও বিষাক্ত অ্যাসিড পোড়ানোর ফলে নির্গত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কারণে আশেপাশের ধানসহ নানা জাতের ফলমূল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাইফুল ইসলাম ফরাজী অভিযোগ করে বলেন, বেশ কয়েক মাস ধরে ক্ষমতার দাপটে কৃষিজমিতে এ বিষাক্ত কারখানা চালানো হচ্ছে। একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও শক্তিশালী প্রভাবের কারণে তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি স্বীকার করে হরিরামপুর এলাকার সিসা কারখানার ম্যানেজার আবুল কালাম জানান, কারখানাটি বৈধ নয় এবং অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চলছে। কারখানার মালিকের নাম-ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে ম্যানেজ করেই এই ব্যবসা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, বৈলর ইউনিয়নের সিসা কারখানার মালিক বিল্লাল কৃষিজমিতে সরকারের অনুমোদন না থাকার কথা স্বীকার করে এ বিষয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শামসুজ্জামান মাসুম জানান, কারখানার বিষয়ে তারা আগে অবগত ছিলেন না এবং ইউপি থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্সও দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিসা ও অ্যাসিড ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান জানান, কৃষিজমিতে সিসা ও অ্যাসিড ফেলার ফলে মাটির উর্বরতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয় এবং সেখানে উৎপাদিত ফসল মানবদেহের খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

প্রশাসনের পদক্ষেপের বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং অবৈধ কারখানাটি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা স্পষ্টভাবে জানান, সিসা তৈরির কারখানা দুটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং তাদের কোনো ছাড়পত্র নেই। দ্রুতই এসব কারখানা বন্ধে প্রশাসনিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।