লন্ডনে হাজার বছরের ইসলামি ঐতিহ্যের প্রদর্শনী

ইউরোপে মুসলমানদের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে ‘আই ওয়াজ বর্ন হিয়ার’ (আমি এখানেই জন্মেছি) শীর্ষক এক অভিনব শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

স্থপতি, লেখক ও শিক্ষাবিদ শাহেদ সেলিম লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট ইস্ট স্টোর হাউজে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইউরোপের দীর্ঘ ইসলামি ইতিহাসের সঙ্গে লন্ডনের বর্তমান মুসলিম সম্প্রদায়ের সংযোগ ঘটিয়েছেন। 

ইউরোপে ইসলাম বহিরাগত ধর্ম, এমন ভ্রান্ত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়া ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণবাদের প্রতিবাদ জানাতে এখানে তিনটি সুবিশাল ও বর্ণিল ট্যাপেস্ট্রি (নকশি কাটা কাপড়) প্রদর্শন করা হচ্ছে।

আল-জাজিরাকে শাহেদ সেলিম জানান, অভিবাসন ও অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী মানুষদের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া ঘৃণাপূর্ণ পরিবেশ এবং ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদী রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই তিনি এই কাজগুলো তৈরি করেছেন। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে সাম্প্রতিক বর্ণবাদী দাঙ্গা এবং অভিবাসীবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে-এর নির্বাচনি সাফল্যের পর এই প্রদর্শনীর তাৎপর্য আরও বেড়েছে।

প্রদর্শিত একটি ট্যাপেস্ট্রির নাম ‘হোম অফিস’। এতে ২০১৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের বিতর্কিত ‘হস্টাইল এনভায়রনমেন্ট’ নীতির আওতায় ব্যবহৃত বিভিন্ন স্লোগান তুলে ধরা হয়েছে। এসব স্লোগানের মধ্যে রয়েছে, ‘গত সপ্তাহে আপনার এলাকায় ১০৬ জন গ্রেপ্তার’, ‘যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন?’, ‘বাড়ি ফিরে যান, নইলে গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হবেন।’

এসব কথার পটভূমিতে ব্যবহার করা হয়েছে স্পেনের ঐতিহাসিক আলহামব্রা প্রাসাদের ইসলামি জ্যামিতিক নকশা। মধ্যযুগীয় স্পেনের ইসলামি শিল্প ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক ব্রিটেনের অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যকে পাশাপাশি রেখে এক গভীর বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে আলতাব আলীর প্রতিকৃতি। ১৯৭৮ সালে বর্ণবাদী হামলায় নিহত হন ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ বাংলাদেশি। লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে তার হত্যাকাণ্ড ব্রিটেনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইতিহাসবিদ তারিক হুসাইন বলেন, ইউরোপ দীর্ঘদিন ইসলামি সভ্যতার শিল্প ও সাংস্কৃতিক অর্জনকে প্রশংসা করেছে। সংরক্ষণ করেছে। উদযাপনও করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিক ও নিপীড়িত করা হয়েছে।

প্রদর্শনীর আরেকটি ট্যাপেস্ট্রিতে দেখা যায়, লন্ডনের নিউহ্যামের কুইন্স মার্কেটের প্রাণবন্ত চিত্র। নানা জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের উপস্থিতিতে মুখর এই বাজারটি স্থানীয়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সম্প্রতি করপোরেট উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাজারটি রক্ষায় আন্দোলনও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এই বাজারের মানুষই বর্তমান সময়ের বিভিন্ন আইন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু তারাই বহুসাংস্কৃতিক ব্রিটেনের প্রতীক।

সেলিম মনে করেন, তার এই শিল্পকর্ম একটি ঐতিহাসিক দলিল। তার আশা, শত বছর পর কেউ যখন এই শিল্পকর্মগুলোর দিকে তাকাবে, তখনও তারা বুঝতে পারবে বর্তমান সময়ের মুসলিমবিদ্বেষ, অভিবাসনবিরোধী মনোভাব এবং ইউরোপের ইতিহাসকে শুধু খ্রিস্টীয় ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতার কথা।