ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দেশটিতে যৌথ হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান দীর্ঘ যুদ্ধের সূত্রপাত করে। উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যাপক সামরিক সক্ষমতা সত্ত্বেও নিজেদের সে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি ওই দুই মিত্র দেশ। বিপরীতে ইরান পশ্চিম এশিয়ায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালায়। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ইসরায়েলেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এই যুদ্ধে হরমুজ প্রণালিকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে ইরান। আর এই প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নই সাত মাসে পড়া এই যুদ্ধের অবসানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের চাপ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি থেকে পিছু হটবে না ইরান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে যে একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তেহরানের পক্ষে তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
প্রায় এক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর গত সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। জবাবে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তেহরান। তবে দুই পক্ষই তাদের হামলা সীমিত রাখায় বোঝা যায় কোনো পক্ষই এখন সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, কোনো পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরতে চায় না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের বাধার সৃষ্টি ও দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ উভয় পক্ষের জন্যই ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করেছেন। ইরানে অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা দাবি করেন, গত মঙ্গলবার তাদের বাহিনী ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দিয়ে প্রণালি পার করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যায় জাহাজের এ প্রণালি পাড়ি দেওয়ার ঘটনা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিতরিনোভিচ বলেন, ‘গত কয়েক দিনের ঘটনা হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট করেছে। পাশাপাশি বর্তমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কৌশলের মধ্যকার মৌলিক অমিলও উন্মোচন করেছে।’ সিতরিনোভিচ এক্সে লেখেন, ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে শুধু অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে লড়াই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে। বিপরীতে ইরান সম্পূর্ণ উল্টো কৌশল নিয়েছে। এ বিশ্লেষক আরও বলেন, ইরান তেলবাহী জাহাজের যাতায়াত ব্যাহত করা অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে প্রণালিতে আধিপত্য বিস্তারে ওয়াশিংটনের চেষ্টাকে তারা চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকবে। সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন ওয়াশিংটন যদি গত জুনের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে, তবে তারাও আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ সন্তুষ্ট।
অর্থনৈতিক টাস্কফোর্স গঠন ইরানের : চলমান সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক সংকট মোকাবিলায় একটি ইকোনমিক ওয়ার টাস্কফোর্স বা অর্থনৈতিক যুদ্ধ টাস্কফোর্স গঠন করেছে ইরান। দেশটির আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ গতকাল রবিবার এই তথ্য জানিয়েছে। ইরানের উপ-অর্থমন্ত্রী মোরতেজা জামানিয়ান জানিয়েছেন ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থায়নসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেবে অর্থ মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত শনাক্ত ও সমাধানের জন্য এই টাস্কফোর্স কাজ করবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গত শুক্রবার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শত্রুরা দেশের অভ্যন্তরে বিভাজন, ফাটল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।