ক্যারিয়ারে সফল হতে নিজেকেই আগে বদলাতে হবে

সফল হতে কে না চায়? যারা কোনো কোম্পানির ব্যাক অফিসের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই একটি ক্ষোভ থাকে সবার ভালো ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে, আমার হচ্ছে না কেন? মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো, নিজের ভুল দেখতে বা স্বীকার করতে না চাওয়া। ক্যারিয়ারে উন্নতি করতে হলে সবার আগে এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বদল আনতে হবে নিজের। লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

কাজকে গুছিয়ে করুন

সবার আগে প্রয়োজন কাজকে গুছিয়ে করা। আপনি যে কাজই করেন, সেটির একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি তৈরি করুন। সম্ভব হলে নিজেই এমন ফরম্যাট বানান, যেখানে প্রয়োজনীয় ডেটা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিপোর্ট তৈরি হবে। বারবার একই রিপোর্ট শূন্য থেকে তৈরি করার প্রয়োজন যেন না হয়।

আপনার প্রতিদিনের কাজ, ১৫ দিন পরপর করার কাজ, মাসিক কাজ সবকিছুর একটি তালিকা তৈরি করুন। কোন কাজের ডেডলাইন কখন, সেটিও লিখে রাখুন। এতে কোনো কাজ ভুলে যাওয়ার বা ডেডলাইন মিস করার সম্ভাবনা কমবে।

Ownership নিয়ে কাজ করুন

করপোরেট জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণগুলোর একটি হলো Ownership অনেকের মধ্যে একটি মানসিকতা থাকে ক্ষতি হলে কোম্পানির হবে, আমার কী? এই চিন্তা বাদ দিতে হবে।

কোম্পানিটিকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করে কাজ করুন। নিজের কোম্পানি হলে যে সতর্কতা, যত্ন ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতেন, এখানেও একইভাবে কাজ করুন। কোনো সমস্যা দেখলে ভাবুন এটি কীভাবে সমাধান করা যায়। শুধু ‘এটা আমার কাজ নয়’ বললে দীর্ঘমেয়াদে আপনার উন্নতি থেমে যেতে পারে।

কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজুন

আপনি যদি প্রতিদিনের কাজকে শুধু দায়িত্ব হিসেবে দেখেন, তাহলে এক সময় কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। একই কাজের মধ্যেও নতুনত্ব আনার চেষ্টা করুন।

বসকে একটু ভিন্নভাবে রিপোর্ট দিন। কম সময়ে কীভাবে বেশি কাজ করা যায়, সেটি খুঁজে বের করুন। একটি পুরনো কাজকে কীভাবে আরও সহজ, দ্রুত ও নির্ভুল করা যায় সেটি নিয়ে ভাবুন। প্রযুক্তির এ সময়ে নিজের কাজকে সহজ করার জন্য AI, Excel, Power BI, Automation  কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি শেখার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করার আগে নিজের কাজটি ভালোভাবে বুঝতে হবে।

শুধু রুটিন কাজ করে থেমে থাকবেন না

বছর শেষে ভালো ইনক্রিমেন্ট চান? তাহলে শুধু রুটিন কাজ করে গেলে হবে না। নতুন দায়িত্ব নিন। নতুন কোনো সমস্যা সমাধান করুন। এমন কিছু করে দেখান, যা আগে কেউ করেনি বা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ভালোভাবে করা যায়। বস যেন বলতে পারেন, ‘এই কাজটি সে করেছে, তাই তাকে একটু বেশি মূল্যায়ন করা যায়।’ আপনি যদি শুধু গতানুগতিক দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে আপনার মূল্যায়নও অনেক সময় গতানুগতিকই হবে।

বসের কাছ থেকে শিখুন

আপনার বস হয়তো আপনার বিভাগের প্রধান। তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আপনার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। তাই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, একজন শিক্ষক হিসেবে দেখুন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট তৈরি করে আগে বসকে দেখান। তার পরামর্শ নিন। এতে আপনার সম্মান কমবে না; বরং বোঝা যাবে আপনি নিজে কিছু করার চেষ্টা করছেন এবং নিজের কাজকে আরও ভালো করতে চান। ভুল হলে বসের কাছ থেকে শিখুন। একই ভুল দ্বিতীয়বার না করার চেষ্টা করুন।

সমস্যার সঙ্গে সমাধানও নিয়ে যান

কোনো সমস্যা দেখলেই শুধু বসকে গিয়ে বলবেন না, ‘স্যার, সমস্যা হয়েছে।” বরং বলুন, “স্যার, সমস্যাটি এই জায়গায় হয়েছে। আমার মনে হয়, এভাবে করলে সমাধান করা যেতে পারে।” সমস্যা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সমাধানের পথ দেখাতে পারা আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে।

নিজের কাজের ফলাফল দৃশ্যমান করুন

অনেক কর্মী ভালো কাজ করেন, কিন্তু তাদের কাজের প্রভাব ম্যানেজমেন্টের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারেন না। শুধু বলবেন না ‘আমি অনেক কাজ করেছি।’

বরং দেখান আপনার কাজের ফলে কত সময় বেঁচেছে, কত ভুল কমেছে, কতগুলো কাজ দ্রুত হয়েছে, কত টাকা সাশ্রয় হয়েছে কিংবা ব্যবসায় কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আপনার কাজের Impact যত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারবেন, আপনার মূল্য তত সহজে বোঝানো যাবে।

বাড়ান যোগাযোগ দক্ষতা

আপনি যত ভালো কর্মীই হন, নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলতে না পারলে অনেক সময় আপনার দক্ষতা আড়ালেই থেকে যাবে। ই-মেইল লেখা, রিপোর্ট উপস্থাপন, মিটিংয়ে কথা বলা, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা এবং নিজের বক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধরার দক্ষতা তৈরি করুন। ভালো কাজের পাশাপাশি ভালোভাবে যোগাযোগ করতে পারাও ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

ডেটা দিয়ে কথা বলুন

করপোরেট জগতে শুধু ধারণা দিয়ে কথা বলার দিন শেষ। সম্ভব হলে আপনার বক্তব্যের সঙ্গে ডেটা দিন। ‘বিক্রি কমেছে’ এটি একটি তথ্য। ‘বিক্রি ১২ শতাংশ কমেছে, এর প্রধান কারণ এই তিনটি’ এটি বিশ্লেষণ। আর ‘এই তিনটি পদক্ষেপ নিলে বিক্রি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে’ এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক তথ্য। আপনাকে ধীরে ধীরে এই পর্যায়ে যেতে হবে।

অন্যের সমালোচনা পরিহার করুন

কেউ গঠনমূলক সমালোচনা করলে তাকে ধন্যবাদ দিন। কারণ সমালোচনা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। আপনি ভালো কিছু করতে গেলে নানা মানুষ নানা কথা বলবে। সব কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যারা কাজের চেয়ে পরচর্চা ও পরনিন্দায় বেশি আগ্রহী, তাদের কথায় নিজের মন নষ্ট করবেন না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারও কাছে নিজের বসের দুর্নাম করবেন না। আজ যাকে ভুল মনে হচ্ছে, কাল হয়তো বুঝবেন তার সিদ্ধান্তের পেছনে এমন কোনো কারণ ছিল, যা আপনি তখন জানতেন না।

প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখুন

প্রযুক্তির এই যুগে নিজেকে আপডেট না রাখলে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অও-এর সাহায্য নিয়ে রিপোর্টের কাঠামো তৈরি করুন, ডেটা বিশ্লেষণ শিখুন, Excel-এর নতুন ফিচার শিখুন, Power BI  বা আপনার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার আয়ত্ত করুন। শুরুতে ভুল হতে পারে। তাতে সমস্যা নেই। করতে করতে দক্ষতা তৈরি হবে। প্রতিদিন অন্তত একটি নতুন বিষয় শেখার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে অনলাইন কোর্স করুন।

নিজের কাজের রেকর্ড রাখুন

বছর শেষে appraisal-এর সময় অনেকেই মনে করতে পারেন না, পুরো বছরে আসলে কী কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তাই নিজের একটি Career Achievement File রাখুন। কোন নতুন রিপোর্ট তৈরি করেছেন, কোন প্রক্রিয়া সহজ করেছেন, কোথায় সময় বাঁচিয়েছেন, কী সমস্যা সমাধান করেছেন, কোন অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছেন সব লিখে রাখুন। এগুলো আপনার নিজের মূল্যায়নেও কাজে লাগবে, ভবিষ্যৎ চাকরির সাক্ষাৎকারেও কাজে আসবে।

নেটওয়ার্ক তৈরি করুন

আপনার মতো একই পদে অন্য কোম্পানিতে যারা কাজ করছেন, তারা কী ধরনের কাজ করছেন তা জানার চেষ্টা করুন। LinkedIn-এ পেশাগত যোগাযোগ তৈরি করুন। অভিজ্ঞতা বিনিময় করুন। অন্যদের কাজের পদ্ধতি থেকে শিখুন। তবে নিজের প্রতিষ্ঠানের কোনো গোপনীয় তথ্য, ডেটা বা ব্যবসায়িক তথ্য কখনো শেয়ার করবেন না।

Negotiation Skill  তৈরি করুন

ক্যারিয়ারে একসময় নিজের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, দায়িত্ব কিংবা কাজের অগ্রাধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে। তখন আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি ও তথ্য দিয়ে কথা বলুন। ‘আমি বেশি ইনক্রিমেন্ট চাই’ এর চেয়ে ‘গত এক বছরে আমি এই কাজগুলো করেছি এবং এগুলোর মাধ্যমে এই ফলাফল এসেছে’ এই বক্তব্য অনেক বেশি শক্তিশালী।

কোম্পানি কীভাবে আয় করে, তা বুঝুন

আপনি যে বিভাগেই কাজ করুন না কেন, কোম্পানি কীভাবে আয় করে, কোথায় খরচ করে, লাভ কীভাবে তৈরি হয় এসব সম্পর্কে ধারণা রাখুন। আপনার কাজ যদি সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না-ও হয়, তবুও বুঝুন আপনার কাজটি কোম্পানির সামগ্রিক ব্যবসায় কীভাবে অবদান রাখছে। যে কর্মী নিজের কাজের পাশাপাশি পুরো ব্যবসাটাও বোঝেন, তিনি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বেশি প্রস্তুত।

Leadership-এর জন্য প্রস্তুত হন

আপনি যদি ভবিষ্যতে বড় পদে যেতে চান, তাহলে শুধু নিজের কাজ ভালো করলেই হবে না। জুনিয়র সহকর্মীকে শেখান। অন্যকে সহযোগিতা করুন। কাজ ভাগ করে দিতে শিখুন। সিদ্ধান্ত নিতে শিখুন। প্রয়োজনে দায়িত্ব নিন। Leadership মানে শুধু অন্যকে দিয়ে কাজ করানো নয়; বরং অন্যদের আরও ভালোভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।

লেখক : ফিচার লেখক, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সেলস অপারেশন, ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড