দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা লাখো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের অন্যতম ঠিকানা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। স্বপ্নের পাশাপাশি সেশনজট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, গবেষণার অপ্রতুলতা ও দক্ষতা উন্নয়নের ঘাটতি তাদের পথকে করে তুলেছে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তবু সম্ভাবনার দুয়ারও উন্মুক্ত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্ন, সংকট ও প্রত্যাশার কথাগুলো সংকলন করেছেন বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
দুর্নীতি দমন করা অতি জরুরি
নানা প্রতিকূলতা জয় করে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এবং মেধার বিকাশ ঘটানোর অদম্য স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই রয়েছে আধুনিক অবকাঠামোর ঘাটতি, নিয়মিত সেমিনার কার্যক্রমের অপ্রতুলতা, গবেষণায় সুযোগ না থাকা, অনিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার, বাস্তবমুখী শিক্ষার সঙ্গে সংযোগহীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা, ক্যারিয়ার গড়ার সুগঠিত পথ না থাকা, দক্ষতা উন্নয়নের সীমিত সুযোগ প্রভৃতির মতো সংকট ও বাধা। এতে শুধু একটি শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে পড়ে না, পিছিয়ে পড়ে পুরো একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা লাখো মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের তরুণের উচ্চশিক্ষার মূল ভিত্তি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তাই আর্থিক সাবলম্বীর দিকটি বিবেচনা করে দুর্নীতি দমন করতে হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জীবন যুদ্ধে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। কাক্সিক্ষত সুযোগ পেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নিজেকে সেরাতে পরিণত করতে পারবেন।
সাদিয়া জাহান হক
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, গণিত বিভাগ, ফেনী সরকারি কলেজ
শিক্ষার পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত সুবিধার উন্নয়ন জরুরি
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে ২,২৫৭টি কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়াই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় শক্তি। সময় বদলেছে, বদলেছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাও। তাই শুধু পরীক্ষা ও সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও চিন্তার বিকাশে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে নতুন সিলেবাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে হলে অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার পরিবেশ, ল্যাব, গ্রন্থাগার ও প্রযুক্তিগত সুবিধার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পনার পাশাপাশি উদ্যোগগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে এই বৃহৎ সংখ্যক শিক্ষার্থী দেশের দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত হবে।
মোছা. সোমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
একটি ক্যাম্পাস, অথচ তার স্বপ্নের পরিধি ছড়িয়ে আছে দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে প্রতিদিন যে তরুণরা বই খুলে বসেন, তাদের চোখে শুধু পরীক্ষার নম্বর নেই, আছে নিজের ভাগ্য বদলে দেওয়ার তাগিদ। কিন্তু সেই স্বপ্নের ক্যানভাসে অনিশ্চয়তার আঁচড়ও কম নয়। দীর্ঘ একাডেমিক অপেক্ষা, সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য, গবেষণা সংস্কৃতির অভাব ও দক্ষতা বিকাশের সীমিত পরিসর অনেক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে আটকে রাখে সময়ের গণ্ডিতে। তবু তারা থামেন না। কেউ পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানকে সঙ্গী করেন, কেউ প্রযুক্তির ভুবনে নিজেকে শানিত করেন, কেউ নেতৃত্ব ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে খুঁজে নেন আগামী দিনের পরিচয়। এখানেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্নিহিত শক্তি। প্রয়োজন এখন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিক্ষাকে শুধু সনদনির্ভর না রেখে দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী নিছক একটি রোল নম্বর নন, তারা সম্ভাবনার অসংখ্য অপ্রকাশিত অধ্যায়। সেই অধ্যায়গুলো উন্মোচনের দায়িত্ব এখন সময়ের।
রনি মুহুরী
দ্বিতীয় বর্ষ, রসায়ন বিভাগ, সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম
শিক্ষায় কর্মসংস্থানমুখী দিকনির্দেশনার অভাব
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা। মফস্বল থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের অসংখ্য পরিবারের সন্তান এখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল উদ্যোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষাসেবা সহজীকরণের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কিছু সংকট এখনো বর্তমান। অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার মানে বৈষম্য, আধুনিক গবেষণাগার ও গবেষণা-সুবিধার সীমাবদ্ধতা, নিয়মিত সেমিনার ও ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগ শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। অনেক শিক্ষার্থী ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানমুখী দিকনির্দেশনার অভাবও অনুভব করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অগ্রগতিকে আরও কার্যকর করতে মাথাপিছু ব্যয়, কলেজভিত্তিক মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। পরিকল্পিত সংস্কার ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থেই গণমুখী ও সম্ভাবনাময় উচ্চশিক্ষার মডেল হয়ে উঠতে পারে।
সরফরাজ স্বপন
শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, গণিত বিভাগ, সরকারি শাহ্সুলতান কলেজ, বগুড়া
টিউশন ফি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বড় বাধা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও উন্নত ক্যারিয়ার গড়ার আকাক্সক্ষা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের চাকরির বাজারের সীমিত সুযোগ ও প্রতিযোগিতার কারণে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজতে আগ্রহী। এ শিক্ষার্থীরা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন এবং অনেকে সফলও হচ্ছেন। শুধু প্রচলিত পড়াশোনা নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে এখন বিশ্বমানের সুযোগ ও দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। আকাক্সক্ষার কয়েকটি কারণ হলো দেশের অভ্যন্তরে উপযুক্ত চাকরির অভাব ও বেকারত্ব শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করে তুলছে। পেশাগত নিরাপত্তা, সম্মানজনক আয় এবং উন্নত জীবনের প্রত্যাশা। চড়া টিউশন ফি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় বাধা। সঠিক গাইডেন্স এবং স্কলারশিপ বা বৃত্তির সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব। আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি অর্জন করে বৈশ্বিক চাকরির বাজারে নিজেদের যোগ্য করে তোলা। বিশ্ব দরবারে নিজেদের তুলে ধরতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের আত্মবিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
উম্মে সালমা
শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজন বাস্তবমুখী সংস্কার
দেশের প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে আসা লাখো মধ্যবিত্ত তরুণের উচ্চশিক্ষার প্রধান আশ্রয়স্থল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। একটি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে পরিবার ও সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন এসব শিক্ষার্থী। তবে তীব্র সেশনজট, মানসম্মত ক্লাসের অভাব এবং প্রথাগত পাঠ্যক্রম তাদের সেই রঙিন স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে প্রতিনিয়ত অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উচ্চশিক্ষার এই বিশাল আঙিনা কেবল সনদ বিতরণের কারখানায় পরিণত হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন থমকে যেতে বাধ্য। তাই শুধু পুঁথিগত বিদ্যার ওপর নির্ভর না করে পাঠ্যসূচিতে সময়োপযোগী কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মমুখী দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে সঠিক প্রশাসনিক সংস্কার ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে অচিরেই এই হতাশার মেঘ কেটে যাবে। লাখো তরুণের সুপ্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠতে পারে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ, হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা