ঈদ থেকে কেন মুক্ত হতে পারছে না সিনেমা

কেন একই গণ্ডিতে বন্দি বাংলাদেশের সিনেমা এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনেকটা ক্লান্ত হতে হয়েছে। একেকজন একেক রকম জবাব দিয়েছেন। হল মালিকরা আর নির্মাতারা বলছেন এক কথা, অন্যদিকে শিল্পী ও কলাকুশলীরা বলছেন অন্য কথা। আবার দর্শকের মন্তব্য একেবারেই আলাদা। লিখেছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব

একসময় পহেলা বৈশাখ, ভালোবাসা দিবস, বন্ধু দিবস, এমনকি স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস উপলক্ষেও মুক্তি পেয়েছে দেশীয় সিনেমা। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কেমন যেন একই গণ্ডিতে বন্দি হয়ে পড়েছে ঢালিউড। ঈদ ছাড়া কোনো সিনেমাকেই মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছেন না লগ্নিকারকরা। বিশেষ করে বিগ বাজেট ও বিগ আর্টিস্টের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা বেশি ঘটছে। যদিও এর পেছনে অনেক কারণও রয়েছে। একদিকে দিনকে দিন প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে আসছে, বুকিং এজেন্টদের সিন্ডিকেট অন্যদিকে চলমান বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা নির্মাণের মতো নির্মাতা ও কলাকুশলীর সংকট। যার দরুন দুইটি ঈদই হয়ে উঠেছে উৎসবমুখর ও প্রতিযোগিতামূলক।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজেট এবং ক্যানভাস আগের চেয়ে অনেক বড় হচ্ছে। অ্যাকশন, থ্রিলার, রোমান্স এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতের মতো বৈচিত্র্যময় থিমে সিনেমা নির্মিত হচ্ছে বর্তমানে।  দেখা যায়, দুই ঈদে যে কয়টি সিনেমা মুক্তি পায়, সারা বছরজুড়েও ততগুলো সিনেমা খুঁজে পাওয়া যায় না। চলতি বছরেও ঠিক একই চিত্র। কারণ ঈদ ছাড়া গত কয়েক বছর ধরেই কোনো ছবি ব্যবসা সফল হচ্ছে না। এ সময়গুলোতে কেবলমাত্র দুয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক বা কথিত বিকল্প ধারার সিনেমা মুক্তি পায়। তাও মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। মূলধারা বা তথাকথিত বাণিজ্যিক ধারার ছবিগুলোর জন্য ঈদই একমাত্র মৌসুম হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরুর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ঈদ এলেই সিনেমা মুক্তির জন্য হিড়িক পড়ে যায়। এতে চলচ্চিত্র শিল্পের খুব একটা লাভ হয় না। সারা বছর সিনেমা মুক্তির তারিখ পড়ে থাকে, কিন্তু ঈদ এলেই প্রেক্ষাগৃহ পাওয়ার জন্য শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। শুধু ঈদকেন্দ্রিক সিনেমা মুক্তির প্রবণতা নিয়ে এখন ভাবার সময় এসেছে। যদি কেবল ঈদেই সিনেমা মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে সারা বছর প্রেক্ষাগৃহগুলোতে সিনেমা চলবে কীভাবে সেই প্রশ্নও সামনে আসে।’

গত দুই ঈদে দর্শকমহলে ঝড় তোলা ‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পরিচালক তানিম নূরের বক্তব্য বাংলাদেশের সিনেমা প্রযোজনা করাটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সহজে নিজের ইচ্ছায় কেউ প্রযোজনায় আসতে চান না। কারণ একটাই, লগ্নিকৃত টাকা ফেরত পাওয়ার ভয়। যদিও  একটা সময় ছিল, ঈদ ছাড়া সারা বছর সিনেমা মুক্তি দিয়ে সেই বিনিয়োগ তুলে আনা সম্ভব হতো। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ঈদে মুক্তি দেওয়া হলে তবুও কিছুটা টাকা উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসা দরকার সবার।

প্রায় একই রকম কথা বললেন পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম। তার ভাষ্য, ‘এভাবে চলতে পারে না। ভঙ্গুর চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য ঈদকেন্দ্রিক বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হতে পারে না, হবেও না। চলচ্চিত্রশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই সারা বছর কিছু কিছু বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দিতে হবে এবং ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে হবে।’

অভিনেতা ও পরিচালক তৌকীর আহমেদ বলেন, চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। এ জন্য বলতে পারি, ১২ মাসই সিনেমা মুক্তি পেতে পারে। তাহলে দর্শকরা দেখবেন, ভালো সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে তখন তারা হলে যাবেন।

অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বললে শুরুতেই নাম আসে মিশা সওদাগরের নাম। একসময় প্রায় প্রতিটি সিনেমায় যাকে দেখা যেত, সেই মিশা এখন বেকার বসে আছেন বলা চলে।  তার কথায়, ‘শুধুমাত্র ঈদের সময় বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দিলে উন্নতি হবে না; সারা বছর ধরেই সিনেমা মুক্তি দিতে হবে। তাহলেই ঢাকাই সিনেমা চাঙা হবে। অন্তত ১২ মাসে ১২টি হিট সিনেমা দরকার।’ মিশা সওদাগরের সঙ্গে একমত পোষণ করে দুই বাংলার চলচ্চিত্রের ব্যস্ত ও আলোচিত অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘স্বীকার করছি, ঈদে দর্শক বেশি হলমুখী হন; কিন্তু আমরা যদি ১২ মাস ধরে ভালো সিনেমা মুক্তির বিষয়টি নিয়ে না ভাবি, তাহলে হবে না। ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজও করতে হবে।’ চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদ বলেন, ‘ঢাকাই সিনেমার দর্শকপ্রিয় নায়ক সিয়াম আহমেদ। ভালো ভালো সিনেমাও সারা বছজুড়ে মুক্তি পাওয়া উচিত। তাহলে দর্শকরা বেশি করে ভালো সিনেমা দেখতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রযোজক ও পরিচালকদের আরও বেশি করে ভাবতে হবে।’

আবার পরিচালকরা বলছেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে নির্মাণ শেষ করার কারণে কাজের মান ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।’ অন্যদিকে দর্শকের বড় একটা অংশ দাবি তুলছেন, ঈদের রেওয়াজ থেকে আমাদের বের হওয়া জরুরি। তা না হলে এটা সিনেমার জন্য আত্মঘাতী ব্যাপার হবে। কাউকে না কাউকে ঈদ ছাড়া সিনেমা মুক্তি দিতে এগিয়ে আসতে হবে। আমি বরাবরই চেয়েছি আমার সিনেমা ঈদ ছাড়াই মুক্তি পাক।