জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার ও আন্দোলন সম্পৃক্ত ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রত্যাহার (দ- মওকুফ) করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভাগীয় মামলার দায় থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযুক্তদের করা আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তাদের শাস্তি মওকুফ ও দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। যা গতকাল রবিবার অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটে এসব প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ জারি হয়। যা সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ নিয়ে আন্দোলনে শুরু হয়। যা পরে মাসব্যাপী চলতে থাকে এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। আন্দোলনকারীরা এনবিআর কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। এনবিআর সংস্কার ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেই সময় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল সরকার।
মূলত আন্দোলনে অংশগ্রহণ, কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। শাস্তি হিসেবে তাদের বেতন স্কেল কয়েক ধাপ অবনমন করা হয়েছিল। পরে দ-প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কয়েকজন রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করেন। আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি তাদের আবেদন মঞ্জুর করায় সংশ্লিষ্ট দ-াদেশ বাতিল এবং কয়েকজনকে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর আগে চলতি বছর ১৮ আগস্ট রাজস্ব সম্মেলনে এনবিআর কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তি তুলে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানান। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৪ জুন বেলা সাড়ে ১১টায় রাজস্ব ভবনের প্রবেশপথে অবস্থান করে ওই বছরের ২২ জুন জারি করা বদলির আদেশ আইনসঙ্গত কারণ ছাড়া অবজ্ঞাপূর্বক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলেন। এর মাধ্যমে তারা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং বদলি আদেশ অমান্যকারীকে সমর্থন করেন।
প্রজ্ঞাপনগুলোতে আরও বলা হয়, এ ধরনের আচরণ চাকরির শৃঙ্খলার জন্য হানিকর, শিষ্টাচারবহির্ভূত ও সরকারি আদেশ অবজ্ঞার শামিল। এটি ‘সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ৩০৩ বিধির লঙ্ঘন এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর পর্যায়ভুক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিভাগীয় মামলায় আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারও বেতন কয়েক ধাপ এবং কারও বেতন কয়েক বছরের জন্য অবনমিত করা হয়েছিল।
এতে আরও বলা হয়, এসব কর্মকর্তা দ-াদেশ মার্জনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি আপিল আবেদন মঞ্জুর করে দ-াদেশ বাতিলের আদেশ দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তাদের মূল বেতনে অবনমিতকরণ সূচক লঘুদ- বাতিল করে তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
শাস্তি মওকুফ পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন উপকমিশনার মো. শাহাদাত জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল বাশার, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া, উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল আলম, কমিশনার জাকির হোসেন, যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির, অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কু-ু, অতিরিক্ত কমিশনার আ আ ম আমীমুল ইহসান, অতিরিক্ত কমিশনার সিফাত-ই-মরিয়ম, অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহাম্মদ তারেক রিকবদার, উপকর কমিশনার জিল্লুর রহমান, উপকর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল, অতিরিক্ত কর কমিশনার মির্জা আশিক রানা, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, যুগ্ম কর কমিশনার মামুন মিয়া, অতিরিক্ত কর কমিশনার মিজ চাঁদ সুলতানা, অতিরিক্ত কর কমিশনার সুলতানা হাবীব, অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ, যুগ্ম কর কমিশনার মিজ মাসুমা খাতুন ও যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন।