বাণিজ্যে ইইউর ৬১ বাধার ৪৮টির সমাধান

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩০ এএম

বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শুল্ক বহির্ভূত ৬১টি বাণিজ্য বাধা দূর করার প্রস্তাব দিয়েছিল। যার মধ্যে ৪৮টির সমাধান করেছে বাংলাদেশ। বাকি বিষয়গুলোও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অঞ্চলটির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরালো ও সহজ করতে এটাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান। এর আগে ইইউ’র প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত মার্চ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনায় বিদ্যমান কিছু নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুততম সময়ে এসব সমস্যার বড় অংশের সমাধান করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।

যেসব সমস্যার সমাধান করা হয়েছে তার মধ্যে, শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন,  বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি করে ২০ হাজার মার্কিন ডলার করা, রপ্তানি পণ্যের ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতা দূরীকরণ এবং যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ ৩ বছর পেছানের জন্য ইইউ’র সমর্থন আশা করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি  ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সুপারিশ ইতিবাচকভাবে এসেছে। আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিশালী সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ, এটি ভোটাভুটির মাধ্যমেও হতে পারে, আবার ভোটাভুটি ছাড়াও পাস হতে পারে।

বোয়িং-এয়ারবাস দৈরথে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ চাইলেন ইইউ রাষ্ট্রদূত : তবে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার অবশ্য এয়ারবাস বিক্রির প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে দেখার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে এয়ারবাসের একটি অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। এটিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।’

বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, এয়ারবাস ও বিমানের মধ্যে দ্রুত আলোচনা সমাপ্তির প্রত্যাশা করছি।’ 

আন্তর্বর্তী সরকারের করা ট্রেড নেগোসিয়েশনের অংশ হিসেবে আমেরিকা থেকে উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ। গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে গত ৩০ এপ্রিল চুক্তি করেছে বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ট্রাম্পের শুল্ক চাপের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বোয়ি থেকেই আগে উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিমান চলাচল ও বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এয়ারবাস ক্রয়-সংক্রান্ত আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আশা প্রকাশ করেন মাইকেল মিলার।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে চলতি সপ্তাহ থেকেই এ বিষয়ে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।

মাইকেল মিলার বলেন, উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে হলে একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয়-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই লাভবান হবে।

জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত : যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সব সময় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জ্বালানি (এলএনজি) ও খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্যের গুণগত মান এবং অপচয়ের হার বিশ্লেষণ করেই সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে থাকে। আমেরিকা থেকে যে গম আমদানি করা হচ্ছে তার অপচয়ের পরিমাণ অনেক কম। তাতে করে মূল্য বেশি পড়ে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত