সোশ্যাল মিডিয়া হোক কল্যাণের মাধ্যম

বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেটে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সহজলভ্যতা জীবনে যেমন গতি এনেছে, তেমনি অনেক ক্ষতির কারণও হয়েছে। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম যে জিনিসটির দিকে অনেক তরুণ হাত বাড়ায়, সেটি স্মার্টফোন। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় চোখ আটকে থাকে। কেউ জ্ঞান অর্জন করছে, কেউ নিজের প্রতিভা প্রকাশ করছে, আবার কেউ অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন কনটেন্টে ডুবে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে একজন মুসলিম তরুণের অবস্থান কোথায়? সে কি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছে, নাকি সোশ্যাল মিডিয়া তাকে ব্যবহার করছে?

ইসলাম প্রযুক্তিবিরোধী ধর্ম নয়। বরং ইসলাম মানুষকে জ্ঞান, চিন্তা ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। তবে একজন মুসলিমের জীবনে কোনো প্রযুক্তিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়া তখনই কল্যাণকর, যখন তা আমাদের সময়, ইমান, চরিত্র ও দায়িত্ববোধকে ধ্বংস না করে বরং এগিয়ে নেয়। সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, এটি আমাদের সময় কেড়ে নেয়। একজন তরুণ হয়তো ভাবছে, মাত্র পাঁচ মিনিট রিলস দেখব, কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট কখন এক ঘণ্টায় পরিণত হয়, তা টেরই পাওয়া যায় না। অথচ সময় মানুষের জীবনের এমন সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আল্লাহ বলেছেন, ‘কসম সময়ের। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’ (সুরা আসর ১-২)

এই সুরা আমাদের শেখায়, সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করলে মানুষ প্রকৃত অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একজন মুসলিম তরুণকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করতে হবে। পড়াশোনা, ইবাদত, পরিবার ও প্রয়োজনীয় কাজের সময় যেন অযথা স্ক্রলিংয়ের কাছে পরাজিত না হয়।

সেখানে আমরা যা দেখছি ও শেয়ার করছি, সেটার হিসাবও আল্লাহর কাছে দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, যাচাই না করে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। একটি মিথ্যা সংবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অথচ মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে দেখো।’ (সুরা হুজুরাত ৬)

তাই কোনো পোস্ট দেখেই শেয়ার করা যাবে না। সংবাদটি সত্য কিনা, এর উৎস কী, কারও সম্মানহানি হচ্ছে কিনা, এসব বিবেচনা করতে হবে। একজন মুসলিমের শেয়ার করা একটি মিথ্যা তথ্য যদি অন্যের ক্ষতির কারণ হয়, তবে তার দায় থেকেও সে মুক্ত নয়।

আগে মানুষের কথাবার্তা সীমাবদ্ধ ছিল সামনাসামনি যোগাযোগে। এখন একটি কমেন্টই হাজার মানুষের সামনে কাউকে অপমান করতে পারে। গালাগালি, কটূক্তি, বিদ্রƒপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে অশালীন মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি)

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম মানুষের আগ্রহ বুঝে একের পর এক কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে। ফলে অনৈতিক ও অশ্লীল কনটেন্ট থেকে নিজেকে দূরে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু কঠিন বলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা নুর ৩০)

তাই একজন তরুণকে নিজের নিউজফিডের প্রতিও সচেতন হতে হবে। যে কনটেন্ট ইমান ও চরিত্রের ক্ষতি করে, তা থেকে দূরে থাকা, আনফলো করা কিংবা ব্লক করা দুর্বলতা নয়, বরং আত্মসংযমের পরিচয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়