শিক্ষক ও কর্মচারীর চরম সংকটে পড়ে গত ৩ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রাম জেলার একমাত্র ‘সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম’ বিদ্যালয়টি। লোহাগাড়া উপজেলায় অবস্থিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকায় চট্টগ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীন ২০০০ সাল থেকে বিদ্যালয়টিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা করে পরবর্তীতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় চাকরি নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেত। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিদ্যালয়টি চালু না থাকায় সেই অর্থ না পাঠাতে পেরে ফেরত পাঠাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থ থাকা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, লোহাগাড়া শাহপীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজস্ব ভবনে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের মূল ফটকে বর্তমানে তালা ঝুলছে। ফলে ভেতরে থাকা আসবাবপত্র ও শিক্ষার্থীদের নানা সামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। ১০ জন শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধাসংবলিত এই আবাসিক বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও পড়ার সুযোগ ছিল।
জেলার একমাত্র স্কুল হওয়ায় লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, হাটহাজারী, কক্সবাজার এমনকি ঢাকা বিভাগের জেলাগুলো থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসত। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়, যাদের মধ্যে ২২ জন এসএসসি পাস করেছে এবং ২১ জন বিভিন্ন দপ্তরে পুনর্বাসিত হয়ে বর্তমানে সচ্ছল জীবনযাপন করছেন।
বিদ্যালয়টির প্রাক্তন শিক্ষার্থী নরসিংদীর বাসিন্দা শিহাব উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, তিনি ২০১৫ সালে এখান থেকে এসএসসি পাস করে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য এমন স্কুল অত্যন্ত জরুরি। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা শেষ করা যোগ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেই এই সংকট দূর হয় এবং তাদেরও কর্মসংস্থান হয়।’ বরাদ্দ থাকার পরও সরকারের উদাসীনতা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী মাদারীপুরের সুমন আহমেদ চৌধুরী জানান, এখান থেকে এসএসসি পাস করে তিনি বর্তমানে ঢাকার দোহার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ইউনিয়ন সমাজকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। দৃষ্টিহীনদের জীবনে আলোর মুখ দেখাতে এই স্কুলের ভূমিকা অতুলনীয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ প্রসঙ্গে লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রিদুয়ানুল করিম জানান, টানা ২৩ বছর চালু থাকা এই বিদ্যালয়ে ২ জন শিক্ষক, ১ জন বাবুর্চি ও ১ জন নিরাপত্তা প্রহরীর পদ রয়েছে, যার সবগুলোই বর্তমানে শূন্য। বিশেষ পঠন পদ্ধতির এই বিদ্যালয়ে লোকবল না থাকায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে স্কুলটি পুনরায় চালুর বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি নিজে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। অর্থ বরাদ্দ থাকলেও মূলত জনবলের অভাবেই এটি বন্ধ রয়েছে। এখানে সরকারি অর্থ নয়ছয় করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য লোকবল জরুরি। বিষয়টি ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়, সচিব ও ডিজিকে জানানো হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করে জানুয়ারিতে স্কুলটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা চলছে।’