চোটের আড়ালে লড়াই, খেলোয়াড়দের মাঠে ফেরান যে দুই ফিজিও

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্যের আলো সাধারণত পড়ে খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাদের ওপর। তবে একজন খেলোয়াড়কে চোট থেকে দূরে রাখা, ইনজুরির পর দ্রুত সুস্থ করে মাঠে ফেরানো কিংবা ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতে নেপথ্যে কাজ করেন আরও অনেক পেশাজীবী। তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্টদের।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ২০০৮ সাল থেকে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন আরিফ যোবায়ের ও রেবেকা সুলতানা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনে খেলোয়াড়দের ইনজুরি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মাঠে ফেরানোর কাজে যুক্ত তাঁরা। এসএ গেমস, বাংলাদেশ গেমস, বিশ্বকাপ কাবাডি, আন্তর্জাতিক কাভা ভলিবল ও আন্তর্জাতিক টেনিসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্পোর্টস হেলথ ও ইনজুরি ব্যবস্থাপনায় কাজ করেছেন তাঁরা।

নারী খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রেবেকা

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মহিলা উইংসের মাধ্যমে স্পোর্টস হেলথ নিয়ে কাজ শুরু করেন রেবেকা সুলতানা। পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী ফুটবল, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কার্যক্রমে যুক্ত হন তিনি।

নারী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ইনজুরি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেশি। দীর্ঘ সময় প্রতিযোগিতায় ফিট থাকা, চোট এড়িয়ে চলা এবং ইনজুরির পর যথাযথ সময়ে মাঠে ফেরাতে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই বিষয়গুলো নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন রেবেকা।

নারী ক্রীড়াবিদদের ইনজুরি প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ফিটনেস ধরে রাখা এবং স্পোর্টস হেলথ সম্পর্কে সচেতন করতেও কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফিজিওথেরাপি সেন্টারের ক্লিনিক ইনচার্জ ও সিনিয়র কনসালটেন্ট ফিজিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেবেকা সুলতানা।

বহু খেলায় ইনজুরি ব্যবস্থাপনায় আরিফ

২০০৮ সাল থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আরিফ যোবায়ের। স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উশু ফেডারেশনের মেডিক্যাল কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

ভলিবল, টেনিস, টেবিল টেনিস, উশু, কাবাডি ও ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় খেলোয়াড়দের ইনজুরি প্রতিরোধ, ইনজুরি ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেছেন আরিফ। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন কার্যক্রমেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা।

বর্তমানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফিজিওথেরাপি সেন্টারের সিইও ও সিনিয়র কনসালটেন্ট ফিজিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

চিকিৎসার আগে গুরুত্ব প্রতিরোধে

আরিফ যোবায়ের ও রেবেকা সুলতানার কাজের অন্যতম মূল দর্শন হলো—ইনজুরি হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি আগে থেকেই তা প্রতিরোধ করা।

একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণের চাপ, বিশ্রাম, পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় ব্যায়াম নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে অনেক ধরনের ইনজুরি এড়ানো সম্ভব। আবার চোট লাগার পর যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন না হলে ছোট ইনজুরিও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ের কোনো খেলোয়াড় দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট দল ও দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও। তাই একজন খেলোয়াড়কে শুধু চোটমুক্ত করাই তাঁদের লক্ষ্য নয়। নিরাপদ, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতার উপযোগী অবস্থায় তাঁকে মাঠে ফেরানোই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।

নেপথ্যের এই লড়াইটাও ক্রীড়ার ভবিষ্যৎ

একজন খেলোয়াড় মাঠে নামার আগে কোচ, প্রশিক্ষক ও সাপোর্ট স্টাফের সহায়তা নেন। একইভাবে মাঠে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে স্পোর্টস ফিজিওদের।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া অবকাঠামো ও স্পোর্টস মেডিসিন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আরিফ যোবায়ের ও রেবেকা সুলতানার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দেশের খেলাধুলায় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে।

ইনজুরির কারণে বাংলাদেশের কোনো প্রতিভাবান খেলোয়াড় যেন ঝরে না পড়েন—দীর্ঘ পথচলায় এই প্রত্যয়ই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। খেলোয়াড়দের চোট প্রতিরোধ, দ্রুত পুনর্বাসন, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিরাপদে মাঠে ফেরানোর মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও শক্তিশালী করতে চান তাঁরা।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও উন্নত স্পোর্টস হেলথ ও ইনজুরি রিহ্যাবিলিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজেই নিজেদের যুক্ত রাখতে চান এই দুই ক্রীড়া ফিজিও।