সংবাদের জবাবে হামলা কেন? গণমাধ্যমের ওপর এত রাগ কেন?

সংবাদ প্রকাশের কারণে একজন সাংবাদিক বা সংবাদপত্রের সম্পাদকের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি মূলত স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। সম্প্রতি সাতক্ষীরায় দৈনিক সাতনদী পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমানের ওপর হামলার অভিযোগ আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে-সত্য প্রকাশের কারণে গণমাধ্যমের ওপর এত রাগ কেন?

তথ্যসুত্র অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার দুপুরে সাতক্ষীরা পৌরসভা ভবনের ভেতরে দৈনিক সাতনদীর সম্পাদক হাবিবুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তিনি ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত কাজে পৌরসভায় গেলে কৃষকদল নেতা হাফিজ ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাবিবুর রহমানের চোখ, মুখ, বুক, গলা ও ঘাড়ে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তাঁকে মেঝেতে ফেলে গলা চেপে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে উদ্ধার করেন। পরে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চান এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান।

ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, হামলার অভিযোগে থানায় এজাহার দেওয়ার পরও তা দীর্ঘ সময় রেকর্ড না হওয়ার অভিযোগ। একজন সংবাদপত্র সম্পাদকের ওপর প্রকাশ্য স্থানে হামলার অভিযোগের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হামলার ঘটনার বিচারহীনতা শুধু ভুক্তভোগীকেই নিরুৎসাহিত করে না; এটি ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলাকারীদেরও উৎসাহিত করতে পারে।

এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। হাবিবুর রহমানের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগেও তিনি সাতক্ষীরা পৌরসভায় গেলে একই ব্যক্তি তাঁকে সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে হুমকি দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তাঁকে বলা হয়েছিল-একজনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করার কারণে তাঁকে ‘সাইজ’ করা হবে। সেদিন উপস্থিত মানুষ প্রতিরোধ করায় পরিস্থিতি বড় ধরনের সংঘর্ষে গড়ায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, কী এমন সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল, যার জেরে একজন সম্পাদকের ওপর বারবার ক্ষোভ ও হামলার অভিযোগ উঠছে?

গত ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবি আদর্শ কলেজের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে দৈনিক সাতনদীতে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের দাখিল করা অভিযোগের ভিত্তিতে এসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। ওইসব প্রতিবেদনে কলেজের শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসে।

এসব প্রতিবেদনের পর কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক নাসিরউদ্দীনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। সম্পাদক হাবিবুর রহমানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে এবং সাতনদী পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। যদিও সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্বই হলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জনসমক্ষে তুলে ধরা।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে-সংবাদে কোনো তথ্য ভুল বা বিভ্রান্তিকর হলে তার প্রতিকার কি হামলা?

অবশ্যই নয়। একটি সংবাদে তথ্যগত ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিবাদ পাঠাতে পারেন। তথ্যপ্রমাণ দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা দিতে পারেন। প্রয়োজন হলে আইনগত প্রতিকারও চাইতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিক বা সম্পাদকের ওপর হামলা কোনোভাবেই সভ্য, গণতান্ত্রিক বা আইনসম্মত প্রতিক্রিয়া হতে পারে না।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে সাংবাদিকেরা ভুল করতে পারেন না। সাংবাদিকতারও জবাবদিহি রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার ভুলের প্রতিকার আইন ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে, পেশিশক্তি দিয়ে নয়। কারণ একজন সাংবাদিককে মারধর করে কোনো সংবাদ মুছে ফেলা যায় না; বরং সেই হামলাই নতুন করে প্রশ্ন তোলে-কেন সংবাদটি নিয়ে এত ক্ষোভ?

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যম ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করবে এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরবে-এটাই স্বাভাবিক। আর এই কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা যদি হামলা, হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে পড়েন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিক বা একটি সংবাদপত্র নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের জানার অধিকার।

সাতক্ষীরার এই ঘটনায় নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন। হামলার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে হামলার পেছনে সংবাদ প্রকাশের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত সমাজে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষোভের বিচার নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। সংবাদ পছন্দ না হলে সাংবাদিককে মারধর করা যাবে-এমন সংস্কৃতি চলতে থাকলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে ঝুঁকির মুখে পড়বে। আর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে যাবে।

আজ প্রশ্নটি তাই শুধু দৈনিক সাতনদীর সম্পাদক হাবিবুর রহমানকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে। সংবাদ প্রকাশের কারণে যদি একজন সম্পাদককে পৌরসভা ভবনের মতো প্রকাশ্য স্থানে হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে অন্য সাংবাদিকদের জন্য বার্তাটি কী?

গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে, সাংবাদিককে মারধর করে কিংবা সম্পাদকের ওপর হামলা চালিয়ে সত্যকে দীর্ঘদিন চাপা রাখা যায় না। বরং এসব ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।

সংবাদ পছন্দ না হতে পারে। সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু তার জবাব হামলা নয়, তথ্য দিয়ে; হুমকি নয়, আইন দিয়ে; পেশিশক্তি নয়, যুক্তি দিয়ে। কারণ গণমাধ্যমের ওপর রাগ যতই থাকুক, সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের ওপর হামলা কখনোই কোনো সভ্য সমাজের উত্তর হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট