পাহাড়, সমুদ্র আর সুনসান শহর

এই শহরের নাম ভিয়ানা দ্য কাস্তেলো। পর্তুগালের উত্তরাঞ্চলের এক সুনসান শহর। শহরের এক পাশে উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় বিশাল সান্তা লুজিয়া চার্চ। আর অন্য পাশে অকুল আটলান্টিক মহাসাগর। মাঝখান দিয়ে বয়ে আসা আঁকাবাঁকা লিমা নদী এখানে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আটলান্টিকের প্রসারিত বুকে। পাহাড়-নদী-সমুদ্র মিলিয়ে প্রকৃতি শহরটাকে পর্যটনের জন্য সৌভাগ্যবান করে রেখেছে।

ভিয়ানা দ্য কাস্তেলো নামটির পেছনে আছে একটা মজার গল্প। অনেক অনেক আগে এই শহরে ছিল এক প্রেমিক যুবক। সে ‘আনা’ নামে এক কিশোরীকে খুব ভালোবাসত। তাকে যখনই দেখতে পেত তখনই সে ‘ভি আনা’ বলে চেঁচিয়ে উঠত। ‘ভি আনা’ মানেÑ ‘আমি আনাকে দেখলাম’। দুর্গকে পর্তুগিজ ভাষায় বলে কাস্তেলো। ভিয়ানা দ্য কাস্তেলো মানে হলো ‘আনাকে দুর্গ থেকে দেখলাম’। গল্প তো গল্পই হয়, ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবুও পর্যটকদের এই গল্প বলে আনন্দ দিতে গাইডদের উৎসাহে কোনো কমতি দেখা যায় না।

লিসবন থেকে ছেড়ে আসা আমাদের বাস রাতের পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে যখন ভিয়ানা দ্য কাস্তেলো পৌঁছল তখন সকালের সোনারঙা রোদ এসে পড়েছে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো সান্তা লুজিয়ার গায়ে। দূর থেকে দেখতে সোনার কেল্লাই মনে হচ্ছিল। সিদ্ধান্ত হলো, শহর দেখা পরে হবে, আগে পাহাড়।

পাহাড়ের ওপরে ওঠার জন্য আছে দুই উপায়। ফুনিকুলার ট্রাম আর সিঁড়িপথ। ফুনিকুলার ট্রাম এক ধরনের ট্রাম যা পাহাড়ের ঢালে বসানো রেলপথ ধরে পর্যটকদের সোজা চূড়ায় নিয়ে যায়। কিন্তু আমরা মনোরম (!) সিঁড়িপথ ধরে দুপাশের প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে ওপরে যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

আনন্দটা প্রথম একশ সিঁড়ি পর্যন্ত ছিল। দুশ ধাপের পর মনে হলো সিঁড়িটা এত খাড়া না বানালেও চলত। তিনশর পর মনে হলো পা দুটো অবশ হয়ে আসছে। এমন সময় একজনকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নামতে দেখে কঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আর কত বাকি? ঝাঁকড়া চুলের তাগড়া লোকটা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেনÑ তোমরা অর্ধেকের বেশি চলে এসেছ। এগিয়ে যাও।

মাথায় যেন বাজ পড়ল, মাত্র অর্ধেক! কিন্তু মাঝপথ থেকে নেমে যাওয়ারও কোনো মানে হয় না। কষ্ট প্রায় একই। তার চেয়ে ওপরে ওঠাই শ্রেয়। এরপর সিঁড়ি গোনা বাদ দিয়ে যে যার প্রভু, করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে ওপরে ওঠা শুরু করলাম।

চূড়ায় উঠে মনে হলো এত কষ্ট বৃথা যায়নি। নিচে পুরো ভিয়ানা শহর। দূরে গাঢ় নীল সমুদ্র। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সান্তা লুজিয়া আসলে কোনো প্রাচীন দুর্গ নয়, নিও বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের এক বিশাল গির্জা।

পরে সারা দিন শহরের অলিগলিতে টো টো করে ঘুরলাম। পুরনো শহরের প্রাণকেন্দ্র প্রাসা দ্য রিপাবলিকা গেলাম। পা ব্যথা করছে। বসে রইলাম কিছুক্ষণ।  খোলা চত্বরে লোকজন কম। অধিকাংশই বুড়োবুড়ি। পর্যটকের আনাগোনা আছে, কিন্তু তাকে ভিড় বলা যাবে না। পুরনো বাড়িঘর, সাদা-কালো কব্বল পাথর-বিছানো রাস্তা, ছোট ছোট ক্যাফে। আমার এক বন্ধু একটা দারুণ কথা বলেছেনÑ জনবহুল ঢাকা শহর থেকে আসার পর পৃথিবীর অধিকাংশ শহরই খাঁ খাঁ লাগার কথা। কথা সত্য। ভিয়ানা দ্য কাস্তেলো আসলেই অনেক শান্ত। শহরে তেমন হইচই নেই। আকাশচুম্বী অট্টালিকা নেই। ঝলমলে শপিংমল নেই। পশ্চিমে যত দূর চোখ যায় সাগরের নীল আর হু হু ঠা-া হাওয়ায় নোনা গন্ধ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। সৈকতের দিকে গিয়ে দেখা পেলাম ভিয়ানার সেই পুরনো সমুদ্রজীবনের আরেক সাক্ষীর গিল এনেশ। ১৯৫৫ সালে এখানকার জেলেদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য তৈরি এই জাহাজটি একসময় গভীর সমুদ্রে নিউ ফাউন্ডল্যান্ড পর্যন্ত যেত। জাহাজে ছিল হাসপাতাল, এমনকি অপারেশন থিয়েটারও। এখন সেটাই জাদুঘর।

শহরটার সঙ্গে সমুদ্রের সম্পর্ক অবশ্য আরও পুরনো। প্রায় চারশ বছর ধরে এখানকার জেলেরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিউ ফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপে যেতেন কড ফিশ ধরতে। ৪ হাজার কিলোমিটারের এই সমুদ্র যাত্রা ছিল উত্তাল ও প্রতিকূল। তাদের স্ত্রী-সন্তানরা বন্দরে অপেক্ষা করতেন জেলেদের ফিরে আসার। কিন্তু সবাই ফিরতেন না। সেই কঠিন সমুদ্রজীবনের স্মৃতি এখনো শহরের শরীরে লেগে আছে। দেয়ালের ক্যানভাসে আঁকা সেইসব চিত্রকর্ম। আগ্রহীরা অ্যালান ভিলিয়ার্স এর লেখা ‘দ্য কোয়েস্ট অব দ্য স্কুনার আর্গাস’ বইটি পড়তে পারেন।

সন্ধ্যার পর লিমা নদীর পাড় ধরে হাঁটলাম। নদীর ওপারে প্রায়া দ্য কাবেদেলো তিন কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা বালুকাবেলা, সার্ফারদের প্রিয় জায়গা। এদিকে নদীর পাড়ের রেস্তোরাঁয় নিভু নিভু আলোয় মানুষ ডিনার করছে। এরা খেতে খেতে গল্প করে না, গল্প করতে করতে খায়। ডিনার করতে দেড়-দুঘণ্টা লেগে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

গভীর রাত পর্যন্ত নদীর পাড়ে বসে রইলাম। মোহনার কাছে অনেক ছোট ছোট ট্যুরিস্ট-বোট নোঙর করা। ধীরে ধীরে শহরের বাতি নিভতে শুরু করল। অতলান্ত মহাসাগরের সামনে এই ক্ষুদ্র জীবনটা আরও ক্ষুদ্র লাগে। রাত ১২টার মধ্যে সুনসান শহর আরও সুনসান হয়ে গেল। কিন্তু আমার আত্মা ততক্ষণে নিশিপক্ষী হয়ে গেছে। শরীরে বিস্তর ক্লান্তি তবু হোটেল রুমে ফিরতে ইচ্ছে করছে না।