জুতার ফ্যাশনে কিছু নকশা থাকে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না; বরং বদলে যাওয়া পোশাক আর রুচির সঙ্গে নতুন চেহারায় বারবার ফিরে আসে। লোফার তেমনই এক জুতা। ফিতা নেই, পরার ঝামেলা পোহাতে হয় না। ফরমাল থেকে ক্যাজুয়াল, অফিস থেকে আড্ডা; প্রায় সবখানেই দিব্যি মানিয়ে যায়। কখনো ক্লাসিক, কখনো চাঙ্কি, আবার কখনো সুয়েডের নরম আবরণে লোফার এখন শুধু আরামের জুতা নয়, ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশনের অনুষঙ্গ। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
লোফারের জন্ম নরওয়েতে। নরওয়েজিয়ান কৃষকরা আরামদায়ক চামড়ার স্লিপ-অন জুতা পরতেন কাজের সুবিধার জন্য। বিশ শতকের শুরুতে মজবুত ও আরামদায়ক এই জুতাকে বলা হতো স্লিপ-অন শু। ১৯০৮ সালে উত্তর আমেরিকা থেকে তৈরির কৌশল শিখে এসে এর নকশা আরও উন্নত করেন নরওয়েজীয় জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিলস গ্রেগোরিউসেন। পশ্চিম নরওয়ের একটি গ্রামের নামে জুতাটির নামকরন করেন অরল্যান্ড শু। নরওয়েতে ঘুরতে আসা মার্কিন পর্যটকদের পায়ে পায়ে এই জুতা পৌঁছে যায় একসময় ইউরোপ-আমেরিকায়। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৩৬ সালে জুতার সামনের অংশে ছোট্ট একটি স্ট্র্যাপযুক্ত বিশেষ নকশার লোফার নিয়ে আসে আমেরিকান ব্র্যান্ড জিএইচ ব্যাস। গত চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের আমেরিকান ছাত্ররা এই স্ট্র্যাপে একটি করে পেনি রাখতেন। কারণ, সে সময় পে-ফোন থেকে জরুরি কল করার জন্য পেনি ব্যবহার করতে হতো। সেখান থেকে পেনি লোফার নামটির উৎপত্তি হয়।
১৯৫০-এর দশকে আমেরিকায় ‘চবহহু খড়ধভবৎ’ জনপ্রিয় হয়। পঞ্চাশের দশকে ঘোড়সওয়ারদের লোফারে ধাতব পাতের ডিটেইল জুড়ে দিয়ে এই জুতাকে রাতারাতি ফ্যাশন আইকনে পরিণত করেন গুচি। শুধু পুরুষের পায়ে আটকে না থেকে লোফার চলে যায় হলিউডের পর্দায়। ষাটের দশকে ইতালিয়ান ডিজাইনাররা লোফারকে ফ্যাশন স্টেটমেন্টে পরিণত করেন। আজ লোফার বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউনিসেক্স ক্লাসিক ফুটওয়্যার।
লোফারের বৈচিত্র্য
সময়ের সঙ্গে নকশায় পরিবর্তন এসেছে লোফারে। জনপ্রিয়তা পেয়েছে টারসেল লোফার, যার সামনে থাকে ঝুলন্ত টারসেল। আভিজাত্য প্রকাশ পায় হর্সবিট লোফারের ধাতব অলংকরণে। লোফার মিউল বা ব্যাকলেস লোফার ক্ল্যাসিক লোফারের আরামদায়ক সিøপ-অন সংস্করণ বলা যায়। ক্যাজুয়াল পোশাক, ঢিলেঢালা ট্রাউজার, স্কার্ট বা ড্রেসের সঙ্গে অনায়াসে মানিয়ে যায়। মোটা রাবার সোলের তৈরি লাগ সোল লোফার পায়ের গ্রিপ বাড়ায়। এদিকে বাড়তি হিল-যুক্ত লোফার উচ্চতার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও এনে দেয়; পাশাপাশি বো ডিজাইনের বেলজিয়াম লোফার, দীর্ঘক্ষণ হাঁটার উপযোগী, ড্রাইভিং লোফার অথবা হালের চাংকি লোফার যেকোনো এক জোড়ায় পা গলিয়ে আরামে হেঁটে যাওয়া যায় বহুদূর।
ইউনিসেক্স এই জুতা ব্লেজারের সঙ্গে অফিসে যেমন, তেমনি সপ্তাহান্তের আড্ডায় জিনস আর টি-শার্টের সঙ্গেও মানানসই। পায়ে মোজা থাকুক বা না থাকুক; দুভাবেই ফিটফাট। আধুনিক অফিসের আউটফিটের প্রথম চয়েস এখন চামড়ার লোফার। সিøম-ফিট জিনসের সঙ্গে সুডো লোফারের জুটি ব্যতিক্রম দেখায়। ফ্লোয়ি ড্রেস অথবা টেইলর্ড স্কার্টের সঙ্গে ব্লক হিলস বা সøাইট প্ল্যাটফর্ম-যুক্ত লোফার মানায় দারুণ।
পেনি থেকে টারসেল
লোফার মূলত এমন এক ধরনের সিøপ-অন জুতা, যার ওপরের অংশে সাধারণত ফিতা বা বকলস থাকে না। পা গলিয়ে সহজেই পরা যায়। তবে সরল নকশার আড়ালে এর বৈচিত্র্য কম নয়। লোফারের সবচেয়ে পরিচিত ধরন পেনি লোফার। সামনের দিকে চামড়ার স্ট্র্যাপের মতো নকশা থাকে, যা একে দেয় ক্লাসিক চেহারা। অফিস কিংবা স্মার্ট-ক্যাজুয়াল দুই ধরনের পোশাকেই এটি সহজে মানিয়ে যায়।
টারসেল লোফারে সামনের অংশে থাকে ঝুলন্ত টারসেল। একটু বেশি ফ্যাশনেবল ও আভিজাত্যপূর্ণ লুকের জন্য এটি বেছে নেন অনেকে। আর হর্সবিট লোফারে সামনের অংশে ধাতব অলংকার থাকে, যা জুতাটিকে আরও ক্লাসিক লুকে পরিণত করে। অন্যদিকে ড্রাইভিং লোফার নরম ও নমনীয় সোলের কারণে আরামের জন্য পরিচিত। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো কিংবা ক্যাজুয়াল ব্যবহারে এটি বেশ উপযোগী। আর যারা নরম, হালকা ও কিছুটা আলাদা নকশা পছন্দ করেন, তাদের জন্য রয়েছে সুয়েড লোফার।
নারী-পুরুষের লোফারে তফাৎ
দূর থেকে দেখলে নারী ও পুরুষের লোফারের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি মনে নাও হতে পারে। তবে ফিট, সোল, হিল, নকশা ও রঙে রয়েছে বেশ কিছু পার্থক্য। পুরুষদের লোফারে সাধারণত কালো, বাদামি, ট্যান, বারগান্ডি কিংবা নেভির মতো রঙ বেশি দেখা যায়। তুলনায় নারীদের লোফারে রঙের বৈচিত্র্য বেশি। অফ-হোয়াইট, বেইজ, প্যাস্টেল, মেটালিক থেকে শুরু করে উজ্জ্বল রঙের লোফারও এখন জনপ্রিয়।
নারীদের জন্য তৈরি লোফারে চাঙ্কি সোল, প্ল্যাটফর্ম বেস কিংবা মিউল-ধাঁচের নকশা দেখা যায়। পুরুষদের মডেলে তুলনামূলকভাবে সিøম ও ক্লাসিক সিলুয়েট বেশি প্রচলিত। তবে এখন এই বিভাজনও অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। চাঙ্কি ও মিনিমাল দুই ধরনের লোফারই নারী-পুরুষ উভয়ের ফ্যাশনে জায়গা করে নিয়েছে। তাইতো লোফারকে এখন বলা হয় ইউনিসেক্স ক্লাসিক ফুটওয়্যার।
কী পরলে মানাবে
লোফারের সঙ্গে পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপলক্ষ। ফরমাল লুকের জন্য কালো বা ডার্ক ব্রাউন লেদার লোফারের সঙ্গে সাদা শার্ট ও ফরমাল ট্রাউজার বেশ মানানসই। একটু কম আনুষ্ঠানিক পরিবেশে চিনোস, পোলো শার্ট ও ব্রাউন লোফার তৈরি করতে পারে স্মার্ট-ক্যাজুয়াল লুক। জিনসের সঙ্গেও লোফার বেশ ভালো যায়। বিশেষ করে সিøম বা স্ট্রেইট-কাট জিনসের সঙ্গে পেনি লোফার হতে পারে চমৎকার জুটি। মেয়েরা ওয়াইড-লেগ প্যান্ট, জিনস, মিডি স্কার্ট কিংবা শার্ট-ড্রেসের সঙ্গেও লোফার পরতে পারেন। মোজার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লোফারের সঙ্গে দৃশ্যমান মোজা এখন আর ‘ভুল’ নয়; বরং অনেক ফ্যাশন লুকে এটিই স্টাইল স্টেটমেন্ট। তবে পোশাক ও জুতার রঙের সঙ্গে মোজার সামঞ্জস্য থাকা চাই।
ট্রেন্ডে এখন কেমন
লোফারের ফ্যাশন এখন দুটি ধারায় এগোচ্ছে। একদিকে রয়েছে চিরচেনা ক্লাসিক সিøম সিলুয়েট, মসৃণ লেদার ও নিট্রোল রঙ। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে চাঙ্কি লোফার। মোটা সোল, ভারী বেস ও কিছুটা ওভারসাইজড চেহারার এই জুতা সাধারণ পোশাকেও আলাদা উপস্থিতি তৈরি করে। সুয়েড লোফার, হর্সবিট ডিটেইল, ভিনটেজ-অনুপ্রাণিত নকশা এবং মিউল-স্টাইলও ফ্যাশনপ্রেমীদের নজরে রয়েছে। অর্থাৎ লোফারের ক্ষেত্রে এখন শুধু ‘ক্লাসিক’ থাকার চেষ্টা নয়, ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী নকশা বেছে নেওয়াই ট্রেন্ড।
দেশে কোথায় পাবেন
দেশের বাজারে এখন অনেক ধরনের লোফার পাওয়া যায়। বাজেটের মধ্যে খুঁজলে বাটা, এপেক্স, বে এবং লোটো-এর মতো পরিচিত ব্র্যান্ডে বিভিন্ন ডিজাইনের লোফার পাওয়া যায়। একটু প্রিমিয়াম মানের চামড়ার জুতা চাইলে দেশীয় লেদার ব্র্যান্ড ও অনলাইন ফুটওয়্যার শপগুলোতেও রয়েছে নানা ধরনের সংগ্রহ। তবে দোকান বা অনলাইন যেখান থেকেই কেনা হোক, শুধু নকশা দেখে সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। পায়ের মাপ ঠিক আছে কি না, হাঁটার সময় গোড়ালি উঠে যাচ্ছে কি না, সোল নমনীয় কি না এবং দীর্ঘ সময় পরলে আরাম থাকবে কি না এসবও দেখতে হবে। শেষ পর্যন্ত লোফারের আসল সৌন্দর্য তার সহজতায়। ফিতা নেই, অতিরিক্ত আয়োজন নেই; কিন্তু পায়ে ওঠার পর পুরো পোশাকের চরিত্রটাই বদলে দিতে পারে। হয়তো এ কারণেই ফ্যাশনের এত পরিবর্তনের মধ্যেও লোফার বারবার ফিরে আসে নতুন রঙে, নতুন সোলে, নতুন নকশায়। একই আত্মবিশ্বাস নিয়ে।