মাত্র এক দশকে বৈশ্বিক ফিনটেক নেতৃত্বে বাংলাদেশের সৈয়দ তানভীর আহমেদ

এক দশক আগে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের জগতে বাংলাদেশের সৈয়দ তানভীর আহমেদের নাম হয়তো খুব বেশি পরিচিত ছিল না। কিন্তু সেই সময় থেকেই নিজের জন্য একটি পথ তৈরি করছিলেন তিনি। শুরুটা ছিল ব্যবসা উন্নয়ন ও বিক্রয় দিয়ে। এরপর একে একে দায়িত্ব বেড়েছে, বদলেছে কাজের পরিধি, যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার। আর সেই পথ ধরে মাত্র এক দশকের ব্যবধানে তিনি এখন ওমানের মাসকাটভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডিবি ইনভেস্টিংয়ের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার।

তার গল্পটি তাই শুধু একটি পদোন্নতির গল্প নয়। এটি একজন বাংলাদেশি পেশাজীবীর ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্স বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন তানভীর আহমেদ। বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সের পাঠ নেওয়ার পর তার পেশাজীবনের গন্তব্য হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা ও বিনিয়োগের বাজার। স্থানীয় পরিসর থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে তিনি যুক্ত হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো বৈচিত্র্যময় বাজারের সঙ্গে।

শুরুতে তার কাজের কেন্দ্র ছিল ব্যবসা তৈরি করা, নতুন গ্রাহক খুঁজে পাওয়া এবং বাজারে প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়ানো। সময়ের সঙ্গে সেই কাজই তাকে নিয়ে যায় আরও বড় পরিসরে আঞ্চলিক ব্যবসা পরিচালনা, অংশীদার নেটওয়ার্ক তৈরি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণের দিকে।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের এই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তী সময়ে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

ওয়ানরয়্যালের (OneRoyal) আঞ্চলিক ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ওমানের বাজার নিয়ে কাজ করেন তানভীর। এর আগে জারা এফএক্সে (Zara FX) সেলস ডিরেক্টর এবং গ্লোবাল মার্কেট ইনডেক্সে (GMI) বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাকে দিয়েছে নতুন বাজার, নতুন মানুষ এবং নতুন ব্যবসায়িক বাস্তবতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ।

কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবসায় কোনো বাজারই অন্য বাজারের মতো নয়। এক দেশে যে কৌশল কাজ করে, অন্য দেশে সেটি হয়তো পুরোপুরি অকার্যকর। কোথাও গ্রাহকের আচরণ ব্যবসার গতিপথ ঠিক করে, কোথাও স্থানীয় অংশীদারত্ব, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রক কাঠামো হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বিষয়।

এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই কাজ করতে করতে তানভীরের অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়তে থাকে।

ওয়ানরয়্যালে তার নেতৃত্বের সময় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে নেট ডিপোজিট পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ৪০ হাজারের বেশি ট্রেডার অনবোর্ড করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে আইবি ও অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং স্থানীয় বাজারের উপযোগী ইসলামিক বা সোয়াপ-ফ্রি আর্থিক পণ্য চালুর অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয় তার ক্যারিয়ারে।

এখানেই তার পেশাগত যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি শুধু বিক্রয় বা ব্যবসা আনার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং ব্যবসার একটি ধারণাকে কীভাবে বাজারে নিয়ে যেতে হয়, কীভাবে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সেটিকে মানিয়ে নিতে হয় এবং কীভাবে সেটিকে পরিমাপযোগ্য প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া যায়—সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাই তার পরিচয়ও বদলেছে।

বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার থেকে সেলস ডিরেক্টর, এরপর আঞ্চলিক ব্যবসা উন্নয়নের নেতৃত্ব। প্রতিটি ধাপে দায়িত্বের সঙ্গে বেড়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। গ্রাহক অর্জনের জায়গা থেকে তিনি পৌঁছেছেন বাজার তৈরির জায়গায়; ব্যক্তিগত বিক্রয় থেকে আঞ্চলিক নেতৃত্বে; আর সেখান থেকে বৈশ্বিক ব্যবসার কৌশল নির্ধারণের পর্যায়ে।

২০২৬ সালে ডিবি ইনভেস্টিংয়ে চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন সৈয়দ তানভীর আহমেদ। তার দায়িত্বের আওতায় ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকাসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজার।

নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পরও তার কাজের কেন্দ্র ছিল একই নতুন বাজারের সম্ভাবনা তৈরি করা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। তবে এবার পরিসর ছিল আরও বড়।

আর এই নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আসে আরেকটি পরিবর্তন। চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসারের দায়িত্ব পেরিয়ে তিনি দায়িত্ব পান ডিবি ইনভেস্টিংয়ের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে।

একই প্রতিষ্ঠানে অল্প সময়ের ব্যবধানে দায়িত্বের এই বিস্তার তার ওপর প্রতিষ্ঠানের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়। কারণ এই পর্যায়ে এসে কাজ আর শুধু ব্যবসা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশ্বিক কৌশল, পরিচালন কার্যক্রম, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয়।

তানভীরের পেশাগত দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো শুধু বিদ্যমান বাজার ধরে রাখা নয়, নতুন বাজারের সম্ভাবনা তৈরি করা।

ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে তার কাজের দিকে তাকালেই সেই ধারাটি দেখা যায়। নতুন বাজারে প্রবেশ, স্থানীয় অংশীদার তৈরি, গ্রাহক বাড়ানো, নতুন পণ্য চালু করা কিংবা ব্যবসার অপ্রচলিত সুযোগ খুঁজে বের করা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল বিস্তারের চিন্তা।

বর্তমান আর্থিক প্রযুক্তির দুনিয়ায় এই মানসিকতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগসেবা বদলে দিচ্ছে পুরো আর্থিক খাতকে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রতিযোগিতা, বাড়ছে গ্রাহকের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার জটিলতাও।

এই পরিবর্তনের মধ্যে একজন বৈশ্বিক ব্যবসায়িক নেতার সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নয়; বরং পরিবর্তনের আগেই তার সম্ভাবনা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সৈয়দ তানভীর আহমেদের ক্যারিয়ারের গল্পে বাংলাদেশের জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে কাজ করতে করতে তার অভিজ্ঞতার পরিধি এখন বৈশ্বিক। সেই অর্থে তার গল্পটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং বাংলাদেশের তরুণ পেশাজীবীদের জন্য একটি সম্ভাবনার গল্পও।

একসময় যে ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট দিয়ে, সেই পথ এখন তাকে এমন একটি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে যেখানে একসঙ্গে দেখতে হচ্ছে বহু দেশ, বহু বাজার, বহু ধরনের গ্রাহক এবং পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি।

এক দশকের পথচলায় বদলেছে পদবি, বেড়েছে দায়িত্ব, বিস্তৃত হয়েছে কর্মক্ষেত্র। কিন্তু যাত্রাটির মূল সুরটি একই থেকেছে নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা।

আজ ডিবি ইনভেস্টিংয়ের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে সৈয়দ তানভীর আহমেদের সামনে তাই নতুন আরেকটি অধ্যায়। আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে আরও নতুন সুযোগ তৈরি করা, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার কৌশল সাজানো এবং সেই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দেওয়া এখন তার বড় দায়িত্ব।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের শ্রেণিকক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ জগতের নেতৃত্বের টেবিল—দূরত্বটা হয়তো ভৌগোলিকভাবে অনেক। কিন্তু একটি ক্যারিয়ারের হিসাবে সেটি পেরোতে লেগেছে মাত্র এক দশক।

আর সেই পথচলাই দেখায়, বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে জায়গা করে নেওয়ার জন্য শুধু একটি ভালো ডিগ্রি কিংবা একটি ভালো চাকরি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাজার বোঝার ক্ষমতা, পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সাহস এবং সুযোগ না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নতুন সুযোগ তৈরি করার মানসিকতা।