নবীনগরে সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যু, অবহেলার অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় বিষধর সাপের কামড়ে উজ্জ্বল মিয়া (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তালতলা মধ্যপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত উজ্জ্বল ওই এলাকার মৃত এহসান মিয়ার ছেলে। তিনি দুই সন্তানের জনক এবং তার স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা।

স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উজ্জ্বল মিয়াকে বিষধর সাপে কামড় দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে ভৈরব এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সেই তার মৃত্যু হয়।

তবে এ ঘটনায় নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে চরম চিকিৎসা অবহেলা ও সময়ক্ষেপণের অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

নিহত উজ্জ্বলের মা আম্বিয়া বেগম আহাজারি করে বলেন, ‘হাসপাতালে নিয়ে আমার ছেলের সঠিক চিকিৎসা করা হয়নি। উল্টো ডাবের পানি খাওয়ানোর পর থেকেই ওর শরীরে তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয়। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা দিলে হয়তো আমার ছেলে বেঁচে থাকত। ওর দুই অবুঝ সন্তান আর স্ত্রীর গর্ভে অনাগত আরেক সন্তানকে রেখে ছেলেটা চলে গেল। এখন এই পরিবার কীভাবে বাঁচবে?’

হাসপাতালে থাকা চাচাতো ভাই ফয়সাল ও ওষুধ সংগ্রহকারী মিজানুর রহমান জানান, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা বাইরের ফার্মেসি থেকে ইনজেকশন কিনে আনতে বলেন। ওষুধ এনে দেওয়ার পর দুটি ইনজেকশন পুশ করেই চিকিৎসকেরা তড়িঘড়ি করে রোগীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে সাপের বিষের পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন (অ্যান্টিভেনম) থাকা সত্ত্বেও রোগীকে তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।

প্রতিবেশী মো. লিটন ও স্থানীয় বাসিন্দা মোর্শেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইতিপূর্বেও এ উপজেলায় আলমনগর গ্রামের এক ব্যক্তি, কনিকাড়ার এক তরুণ ও নূরপুরের এক নারী সাপের কামড়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত থাকার পরও রোগীদের তাৎক্ষণিক সেবা না দিয়ে রেফার করে দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. মোসলিমা সাঈদিয়া বলেন, ‘রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা জরুরি বিভাগে তাঁকে গ্রহণ করি। সাপে কাটার ক্ষেত্রে নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী তাৎক্ষণিক রোগীর ২০ মিনিট ব্লাড ক্লট টেস্ট (20WBCT) করানো হয়। টেস্টে দেখা যায়, রক্ত স্বাভাবিকভাবেই জমাট বেঁধেছে, যা একটি ভালো লক্ষণ। এছাড়া ওই সময় রোগীর সঙ্গে কথা বলে তার শরীরে বিষক্রিয়ার কোনো প্রত্যক্ষ লক্ষণ বা উপসর্গ (সাইন-সিম্পটম) পাওয়া যায়নি। তবে সাপের বিষক্রিয়া অনেক সময় দেরিতেও প্রকাশ পেতে পারে। অন্যদিকে রোগীর স্বজনরাও এখানে না রেখে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করছিলেন। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে এবং স্বজনদের ইচ্ছায় আমরা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন করি এবং উন্নত পর্যবেক্ষণের জন্য রোগীকে জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করি। হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত থাকলেও সুনির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণ ছাড়া তা প্রয়োগের সুযোগ নেই; কারণ অ্যান্টিভেনমের তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করেই রোগীকে হায়ার সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল।’

নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে সাপে কাটা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (এএসভি) মজুত রয়েছে। নির্দিষ্ট ফ্রিজে এটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকলও তৈরি করা আছে। বিষধর সাপে কাটার লক্ষণ দেখা দিলে স্বজনদের সম্মতিসাপেক্ষে চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’