রাশিয়ারও নজর এবার বাংলাদেশে

বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যে আমেরিকার পর এবার রাশিয়া প্রবেশের চেষ্টা করছে। বঙ্গোপসাগরের একই স্থানে আমেরিকা ও রাশিয়াকে প্রকল্প করার সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সব দিক বিবেচনা করে সরকারের এগোনো উচিত। সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে বলে তারা মনে করছেন। এই উদ্যোগ কার্যকর হলে এটি হবে দেশের চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল।

পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, মহেশখালীতে এলএনজি খালাস করার জন্য একটি গ্র্যাভিটি-বেইজড স্ট্রাকচার (জিবিএস) স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসি। পেট্রোবাংলার কাছে গত ৩ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটি প্রস্তাব দেয়। কোম্পানিটির ৩২ স্ল্যাইডের প্রেজেন্টেশনে দেখা যায়, জিবিএস নির্মাণের অর্থায়ন, এলএনজি ক্রয়, টার্মিনাল উন্নয়ন এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে চায় নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসি।

নোভাটেক মিডলইস্টের এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের জিবিএস স্থাপনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, রাশিয়াতেও একই নামে একটি কোম্পানি রয়েছে। পেট্রোবাংলার কাছে যে প্রেজেন্টেশন নোভাটেক মিডলইস্ট দিয়েছে, সেখানে কোম্পানির যে লোগো ব্যবহার করা হয়েছে, রাশিয়ার নোভাটেক কোম্পানির লোগোও একই। একই নাম ও লোগোর কারণে নোভাটেক মিডলইস্ট এবং রাশিয়ার নোভাটেক পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বলে ধারণা করা যায়। ২০২৩ সালের ২৯ জুন করা একটি চুক্তিতে রাশিয়ার নোভাটেককে লাইসেন্সদাতা এবং নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসিকে লাইসেন্সগ্রহীতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কোম্পানি দুটি যে একই মালিকানাধীন, তা প্রমাণিত। এ ছাড়া, সামাজিক মাধ্যমে নোভাটেক মিডলইস্টের কয়েকজন কর্মকর্তার প্রোফাইল পাওয়া গেছে। তাদের রুশ ভাষাজ্ঞান এবং আগের কর্মস্থল হিসেবে মস্কোর উল্লেখ রয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর নোভাটেক মিডলইস্ট তাদের প্রেজেন্টেশন পেট্রোবাংলায় দিয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে রাজি হননি পেট্রোবাংলার শীর্ষ একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রেজেন্টেশন তো অনেকেই দিতে পারেন।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রতি মাসে এখন ১০ কার্গো এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। এখন খোলা বাজার থেকে প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানি করতে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। সেই হিসাবে মাসে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করতে হয়। দাম এমন থাকলে বছরে প্রায় ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানি করতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে এই ব্যয় কমে আসতে পারে।

নোভাটেক মিডলইস্টের প্রস্তাবে কী আছে : নোভাটেক তাদের প্রস্তাবে বলছে তারা মহেশখালীতে একটি গ্র্যাভিটি-বেইজড স্ট্রাকচার (জিবিএস) নির্মাণ করতে চায়। প্রস্তাবে বলা হয়েছে সমুদ্রের তলদেশে বসানো বিশাল কংক্রিটের কাঠামোর ওপর তৈরি হবে স্থায়ী টার্মিনাল। ফলে এটি ভাসমান টার্মিনালের মতো ঢেউ বা ঝড়ের সঙ্গে দুলবে না। জিবিএস টার্মিনালে এক মাসের গ্যাসের মজুদ রাখা যাবে। এখান থেকে ছোট কার্গোতে করে এলএনজি দেশের আরও চারটি স্থানে সরবরাহ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রস্তাবে।

এটি হবে এলএনজি গ্রহণ, সংরক্ষণ ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অবকাঠামো। বড় আকারের এলএনজি জাহাজ সরাসরি সেখানে এসে খালাস করতে পারবে।

এই এলএনজি ব্যবস্থাপনায় দুটি পদ্ধতির কথা বলেছে নোভাটেক। প্রথম পদ্ধতিতে এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে সমুদ্রের নিচ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এলএনজি তরল অবস্থায় ছোট জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হবে। এতে নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।

নোভাটেক দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৫ হাজার ঘনমিটার এলএনজি বহন করতে সক্ষম ছোট জাহাজ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। এসব জাহাজে করে নদীপথে এলএনজি পরিবহনের জন্য চারটি রুটের কথা বলা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, নরসিংদীর ঘোড়াশাল ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে এসব জায়গায় ছোট আকারের রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট) স্থাপন করে সমুদ্রবন্দর থেকে এলএনজি সরাসরি বড় পাইপলাইনের মাধ্যমে না নিয়ে নদীপথে ছোট জাহাজে করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। পরে এসব এলাকায় এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে স্থানীয় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে সরবরাহ করা যাবে।

নোভাটেক দৈনিক ৯৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ৩২ মাস সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে ৯৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন ঝড়ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি খালাস বাধাগ্রস্ত হয়।

ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের টার্মিনালের সঙ্গে সরকার ১৫ বছরের গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করে। অন্যদিকে নোভাটেক ৯৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলছে। এ ধরনের টার্মিনাল ৬০ থেকে ৮০ বছর গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। এমনকি ভাসমান টার্মিনালের তুলনায় দ্বিগুণ গ্যাস সরবরাহ করতে পারে।

এখন মহেশখালীতে কী আছে : মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এই টার্মিনাল দিয়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করা যায়। এ জন্য সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে একটি ৬ কিলোমিটার সাবসি পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাইপলাইন দিয়েই এখন দুটি টার্মিনাল গ্যাস গ্রিডে পাঠায়।

এখানের দুটি টার্মিনালের একটি যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির, অন্য টার্মিনালটি দেশীয় উদ্যোক্তা সামিট পাওয়ারের। তবে দুটি টার্মিনালই পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে গ্যাস পাইপলাইন রয়েছে, তা দিয়ে ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়। অর্থাৎ, এই পাইপলাইন দিয়ে আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে।

সরকার নতুন করে চীনা একটি কোম্পানিকে মহেশখালীতে প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে এমন একটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দিতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) জুনের শেষ দিকে সরকারের কাছে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়।

বাধা হতে পারে মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি : নোভাটেক মিডলইস্টের প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হতে পারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন : বুয়েটের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন আমাদের কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা সবার আগে দেখতে হবে। তিনি মনে করেন, যেকোনো ধরনের প্রস্তাব যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করা উচিত। আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি দেখা যায় আমেরিকা অনুমতি দিচ্ছে না, তাহলে তখন এটি নিয়ে চিন্তা করা যাবে। তবে যেকোনো স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণ রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে পেট্রোবাংলার করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এটা নির্ভর করবে সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর। ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পুরো সংকটের সময় ভারত রাশিয়ার জ্বালানি তেলে কিনেছে। আমরা সেটা করতে পারব কি না, সেটি নির্ভর করবে সরকারের দক্ষতার ওপর। বিষয়টি সরকার দক্ষতার সঙ্গে মোকোবিলা করতে পারলে দেশ লাভবান হবে। আর না পারলে আমেরিকা লাভবান হবে।