রুমিন ফারহানার বক্তব্যে সংসদে উত্তাপ

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে উত্তাপ ছড়িয়েছে। গতকাল বুধবার রাতে ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে নির্বাচিত রুমিন ফারহানা বলেন, ‘প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না এটি তো হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আবার সারের সংকট হবে না। সারে যারা গরিব কৃষক আছেন, তারা সার কারখানায় গিয়ে সেটি লুট করবেন না সেটিও হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটিও হওয়া সম্ভব না। মাননীয় স্পিকার, বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটিও তো হতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া, ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার উপরে ঋণখেলাপি হওয়া ইত্যাদি।’

তখন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করেন। এ সময় রুমিন ফারহানা বলেন, এত অসহিষ্ণু সংসদ! মনে হয় যেন একেবারে আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা মন্দ না। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন একই ধরনের আচরণ করছে, আরও খারাপ আচরণ বরং বলি।

এরপর ব্যাংক রেজল্যুশন বিলে যুক্ত করা নতুন ধারার প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘যাই হোক, মাননীয় স্পিকার, এই আইনটিতে ১৮-এর ক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছিল ১৮-ক রাখা হবে না। কেন রাখা হচ্ছে? এর কারণ হচ্ছে এই সংসদ, বেশিরভাগ সংসদ সদস্য ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত।’

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা এগুলো আমাদের পুরনো সংস্কৃতি। এগুলো আমরা বহু দেখেছি। ইলেকশনের আগে তাড়াতাড়ি রিট, খেলাপি থেকে বাদ দেয়। আর ইলেকশনটা যেই শেষ হয়, ওকে এই...’। এ পর্যায়ে সংসদে আবারও হট্টগোল শুরু হয়।

এ সময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘ধন্যবাদ মাননীয় সদস্য, বসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডেপুটি স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, এভরিওয়ান প্লিজ কিপ কোয়েট। মাননীয় সদস্য, আপনি বসেন।’

হইচই অব্যাহত থাকলে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় চিফ হুইপ, মাননীয় সদস্য আপনি বসেন। উইথ অল দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট, প্লিজ কিপ কোয়েট, প্লিজ কিপ কোয়েট।’

স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় চিফ হুইপ, একজন মাননীয় সদস্য বক্তব্য রাখছেন। শি হ্যাজ এভরি লিবার্টি টু স্পিক। বাট অন্য মাননীয় সদস্যরা উনার বক্তব্য প্রদানে বাধা প্রদান করেন, সেটি কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আপনাকে অনুরোধ করব, অনারেবল মেম্বারস অব দ্য পার্লামেন্ট, যারা আছেন প্রত্যেকের এখানে লিবার্টি আছে। তারা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। আপনাদের টার্ন যখন আসে, আপনারা তখন সেটি খণ্ডন করবেন। কিন্তু বক্তব্য প্রদানে বাধা প্রদান করা কোনো অবস্থাতেই কাম্য না।’

এরপর স্পিকার পরবর্তী বক্তা হিসেবে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যকে আপনি সুযোগ দিয়েছেন, হতে পারে তার কথাগুলো সব সঙ্গত নয়। আবার হতে পারে যে কথাগুলো তার গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কিছুই শুনতে পারলাম না। তার কথাগুলো শোনার যেমন দায়িত্ব আমাদের আছে, বলারও অধিকার তার আছে। তিনি যদি আনপার্মেন্টারি কোনো কথা বলে থাকেন, সেটি আপনার জায়গা থেকে রুলিং আসতে পারে। আবার এ সমস্ত কথার জবাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যখন দাঁড়াবেন, তিনি যদি প্রয়োজন মনে করেন তিনি দিতেই পারেন। এ সময় রুমিন ফারহানা বক্তব্য রাখতে কয়েকবার দাঁড়ালেও তাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। এরপর চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘আমরা চাই সংসদে সকল সমস্যার সমাধান হোক কিন্তু সংসদে সমস্যার সমাধানের চেয়ে যদি আমরা সমস্যা তৈরি করি নিজেরা, সেটি একটি প্রবলেম। আমরা চাই এখানে গঠনমূলক আলোচনা হোক। আমরা সংসদে এমন আলোচনা যদি করি যে, আলোচনা একজনকে আহত করে অথবা একজনকে ক্ষতি করে, সে আলোচনা আমরা করতে চাই না।’

এ সময় চিফ হুইপকে উদ্দেশ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আপনার মূল দায়িত্ব হাউজে শৃঙ্খলা রাখা। আমরা প্রত্যাশা করব যার যার স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিকভাবে পরিষ্কারভাবে বক্তব্য রাখবেন।’

প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ প্রসঙ্গ সংসদে

এদিকে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির এজলাস ত্যাগের ঘটনায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। এ ধরনের ঘটনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল নিয়ে জনমনে কী বার্তা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল বুধবার রাতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।

ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন শুধু একজন আইনজীবী নন, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করে।

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্য যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, তা অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। তবে এ ঘটনাকে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ বা ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’-এর বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যে আইনজীবীর আচরণ নিয়ে ঘটনা ঘটেছে, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বার অ্যাসোসিয়েশন রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের কোনো অঙ্গের অংশ নয়; এটি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত আইনজীবীদের একটি সংগঠন। তাই ওই আইনজীবীর আচরণকে কোনো রাষ্ট্রীয় অঙ্গের আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

বার ও বেঞ্চের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে বা আইনজীবী ও বেঞ্চের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেও অনেক সময় আদালতের বাইরে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে। অতীতের একটি আদালতকেন্দ্রিক ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। আইনমন্ত্রী জানান, আগের দিনের ঘটনার পর প্রধান বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করলেও পর দিন সকাল ৯টায় তিনি যথারীতি আদালতের কার্যক্রম শুরু করেছেন। এমনকি ওই আইনজীবীও প্রধান বিচারপতির আদালতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে মামলায় অংশ নিয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।