সময়ের পরিক্রমায় আমাদের সমাজব্যবস্থায় দৃশ্যমান অবকাঠামোগত অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু অদৃশ্য নৈতিক অবক্ষয় তীব্র আকার ধারণ করছে। বাহ্যিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়লেও পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। একটি সুস্থ, শান্তিময় ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথে এই নৈতিক সংকট আজ অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই সংকট থেকে উত্তরণ না ঘটাতে পারলে আমাদের আগামী প্রজন্ম এক গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকটের মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
সম্পর্কের শীতলতা ও আস্থার সংকট : বর্তমান সমাজের অন্যতম বড় ব্যাধি হলো মানুষের প্রতি মানুষের আস্থার চরম অভাব। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, স্বার্থপরতা বা গুজবের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত সন্দেহ করার প্রবণতা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোকে ভেতর থেকে গ্রাস করছে। অথচ যেকোনো সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সদ্ভাব, ক্ষমা ও সৌহার্দ্য। আমরা যদি একে অপরকে ইতিবাচকভাবে না নিয়ে সর্বদা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা কুধারণার চোখে মূল্যায়ন করতে থাকি, তবে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্তর পর্যন্ত কোথাও শান্তি বজায় থাকতে পারে না।
অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অযথা সন্দেহ থেকে দূরে থাকার যে শাশ^ত শিক্ষা আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দর্শনে রয়েছে, তা আজ চরমভাবে উপেক্ষিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক অনুশাসনের ভূমিকা : নৈতিকতা ও মূল্যবোধের এই অবক্ষয় রোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত আমাদের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন বা যান্ত্রিক শিক্ষা দিয়ে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
সাধারণ শিক্ষালয় কিংবা কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা, সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের কোমল মনে পরমতসহিষ্ণুতা, সত্যনিষ্ঠা ও ইনসাফের বীজ বপন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও দায়িত্বশীল আচরণ : তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে যেমন গতিশীল করেছে, তেমনি এর অপরিমিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবহার সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। যাচাই-বাছাই না করে তথ্য শেয়ার করা, সামান্য ভুলের জেরে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা, অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং অন্ধ অনুকরণ সমাজকে তীব্র বিভক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ কোনো তথ্য পাওয়ার পর তা যাচাই করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নাগরিককে নিজের অবস্থান থেকে প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল হতে হবে।
করণীয় ও উত্তরণের পথ : এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বে এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। মনগড়া সন্দেহ, অহংকার ও কুধারণা পরিহার করে সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, সামষ্টিক কল্যাণে সবাইকে সচেতন করে তুলতে দেশের মিডিয়া, প্রথিতযশা লেখক, শিক্ষক, আলেম সমাজ এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু আইন দিয়ে মানুষের ভেতরকার অপরাধপ্রবণতা দূর করা সম্ভব নয়, যদি না মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়।
লেখক : খতিব ও মাদ্রাসা পরিচালক