সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কার্যক্রম ধরে রাখতে জনতা ব্যাংকের ৩০ কোটি দিরহাম বা প্রায় ৮ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার মার্কিন ডলার মূলধন সহায়তা দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩ কোটি টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার পর গত মঙ্গলবার রাতেই অর্থ পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মজিবুর রহমান।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউএইতে ব্যাংকের কার্যক্রমে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন দিরহামের যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণে অর্থ পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পরই অর্থ পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমতি দিয়েছে। আমাদের এফআরডি ও বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছিল। এফআরডিকে লেখার পর বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর যে ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম শর্টফল ছিল, সেটা আমরা পাঠিয়েছি।’
এর আগে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ‘মূলধন সংকটে আমিরাতে বন্ধ হচ্ছে জনতা ব্যাংকের ৪ শাখা!’ এমন শিরোনামে সংবাদ প্রচার হলে সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি আরও গুরুত্বসহকারে নেন তারা।
ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটিতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। মূলধন ঘাটতি পূরণ না হলে শাখাগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসক নিয়োগের নির্দেশও দিয়েছিল দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারের অর্থ জোগানের ফলে আপাতত দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি ও আল আইন, জনতা ব্যাংকের চার শাখার কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইউএইতে ব্যাংক পরিচালনার নিয়ম অনুযায়ী জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন থাকার কথা ৪০ কোটি দিরহাম। এর বিপরীতে ব্যাংকটির মূলধন ছিল ১০ কোটি দিরহাম। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩০ কোটি দিরহাম। এই ঘাটতি পূরণে অর্থ বিভাগ জনতা ব্যাংককে ৮ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার ১০৪ মার্কিন ডলার পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলধনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ না করায় চলতি বছর একাধিকবার জনতা ব্যাংককে চিঠি দেয়। সর্বশেষ চিঠিতে শাখাগুলোকে নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলা ও নতুন কোনো সেবা দেওয়া বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
এ অবস্থায় ইউএইতে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধনের শর্ত পূরণের উদ্যোগ নেয় সরকার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক চিঠিতে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন সম্পদের সংরক্ষিত উপখাত থেকে স্থানীয় অফিসের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে এ অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের বাজেটে কোনো আর্থিক সংস্থান সৃষ্টি করা যাবে না বলেও জানানো হয়।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত জনতা ব্যাংক দেশের অন্যতম বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৯৭৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে বর্তমানে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল-আইনে চারটি পূর্ণাঙ্গ শাখা এবং আবুধাবিতে একটি প্রধান নির্বাহী কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সেবা দিচ্ছে।
বর্তমানে আরব আমিরাতে প্রায় ১০ লাখ রেমিট্যান্স-সংশ্লিষ্ট গ্রাহক, প্রায় ৭০ হাজার আমানত হিসাবধারী এবং প্রায় ৩ হাজার ৮০০ ঋণগ্রহীতাকে সেবা দিচ্ছে জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশ থেকে প্রেষণে নিয়োজিত ২০ জন এবং স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ৭৫ জনসহ মোট ৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে কাজ করছেন। ব্যাংকটি রেমিট্যান্স, ঋণ, বৈদেশিক ব্যাংক গ্যারান্টি, ডলার বিনিয়োগ ও প্রিমিয়াম বন্ড বিক্রিসহ বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে। গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ইউএই কার্যক্রমে আমানত, ঋণ বিতরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।