পাকা ভবনের আশায় স্কুলঘর নিলামে বিক্রি করে দিয়ে শিক্ষার্থী নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনো অবকাঠামো নেই। পাশের কবরস্থানের একটি ছাপড়াঘর এনে কোনো রকমে বিদ্যালয়টির পাঠদান চালানো হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ জানান, ছোট একটি পরিত্যক্ত ঘরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসেন। পাশের কবরস্থান থেকে ছাপড়া এনে বেড়া ছাড়াই সেখানে ক্লাস নেওয়া হয়।
তবে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে একটি দ্বিতল পাকা ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ এলেও যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ এবং লোকসানের আশঙ্কায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাত দেখিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু না করেই চলে যায়।
তিনি জানান, ১৯৪১ সালে ১৩ নম্বর জালালপুর ইউনিয়নে লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টির লেখাপড়ার মান ভালো। তবে অবকাঠামোর অভাবে শিক্ষার্থীরা আসতে চায় না। অভিভাবকরাও ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। এ অবস্থার মধ্যেও বর্তমানে প্রায় শতাধিক ছেলে-মেয়ে বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। তাদের ধরে রাখতে শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা জরুরি। কর্তৃপক্ষ ‘দিচ্ছি, করছি’ বলে দুই বছর পার করে দিয়েছে। অভিভাবকরাও এখন কোনো অজুহাত শুনতে চান না।
এদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, টিনের ছাপড়া ঘরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ক্লাস করতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি হলে ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। অভিভাবক মুক্তি খাতুন ও রিতু খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘরের বেড়া ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় গরমে স্কুলে ছেলে-মেয়েরা প্রায়ই অসুস্থ বোধ করে। অনেক ছেলে-মেয়ে বিদ্যালয়ে আসতে চায় না।
এদিকে এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী রাহাত ইসলাম জানান, ২০২৪ সালে লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। পরে সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না, জায়গার স্বল্পতা, বিদ্যালয়ের পাশে বড় খাল ও যমুনা নদীর ভাঙনের ঝুঁকি থাকাসহ বেশ কয়েকটি কারণ দেখিয়ে টেন্ডার আহ্বানের প্রায় ছয় মাস পর সেটি বাতিল করে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর। বরাদ্দের টাকাও ফেরত চলে যায়।
রাহাত ইসলাম আরও জানান, ঠিকাদারের কোনো গাফিলতি নয়; স্কুলটি যমুনা তীরবর্তী হওয়ায় এখানে বহুতল পাকা ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। এ কারণে বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষ চর-ডিজাইনের (স্টিলের ফ্রেমের অবকাঠামো) সেমিপাকা ভবন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ জানান, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো নয়, মালামাল আনতে খরচ বেশি পড়বে। তাই কাজ করে লাভের বদলে লোকসান হবে—এমন কথা বলে কোনো কাজই শুরু করা হয়নি। তিনি আরও জানান, ভবন নির্মাণের আগে জায়গার নকশাসহ সব জরিপের কাজ শেষে উপজেলা থেকে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, যমুনা নদী বিদ্যালয় থেকে অনেক দূরে। ভাঙনের কোনো ঝুঁকি নেই। তবে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হলেও বর্ষায় নৌপথে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, তিনি এ উপজেলায় যোগদানের আগে স্কুল ভবনের টেন্ডার বাতিল হয়েছে। তাই বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বিদ্যালয় ভবনের জন্য দ্রুত বরাদ্দ পাওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, দুর্গম পথে মালামাল নিতে খরচ বেশি হবে। লোকসানের আশঙ্কায় ঠিকাদার হয়তো কাজ শুরু করেননি। তবে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জনদুর্ভোগ দূর করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের দায়িত্ব।