জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ তার রবকে চিনতে পারে, নিজের দ্বীনকে বুঝতে পারে এবং সত্য ও মিথ্যা, কল্যাণ ও ক্ষতিকর বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। জ্ঞানের মাধ্যমে ইমান ও আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ লা বলেন, ‘বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।’ (সুরা ফাতির ২৮)
মানুষের জীবন পরিচালনা, স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে যেকোনো উপকারী জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি সেই জ্ঞান অর্জনের পেছনে নিয়ত শুদ্ধ থাকে, তবে সেটার জন্য সওয়াব হয়, প্রচেষ্টা বরকতময় হয় এবং প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।
শিক্ষক হলেন মহৎ ব্যক্তি। তিনি শিক্ষার্থীদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন, তাদের মাঝে মূল্যবোধের বীজ বপন করেন, উদ্যম জাগিয়ে তোলেন এবং তাদের স্রষ্টা ও রিজিকদাতার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেন। কত মূল্যবোধ রয়েছে, যা একজন কিশোরের অন্তরে রোপিত হয়। কত উপদেশ রয়েছে, যা একজন বিভ্রান্তকে পথ দেখায়। আবার কত আচরণ রয়েছে, যা কোনো শিক্ষার্থীকে দুঃখ বা বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করে। আর আল্লাহ কখনো সৎকর্মশীলের প্রতিদান নষ্ট করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখায়, সে ওই কল্যাণকর্ম সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।’ (সহিহ মুসলিম)
একজন শিক্ষকের জন্য দুনিয়ার অন্যতম সৌভাগ্য ও গৌরবের বিষয় হলো, একদিন তিনি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের রোপণ করা বীজের ফল দেখতে পান। তার কোনো শিক্ষার্থী চিকিৎসক হয়ে মানুষের চিকিৎসা করছে, দেশের সেবা করছে। কেউ প্রকৌশলী হয়ে উন্নয়নের স্থাপনা গড়ে তুলছে। কেউ কর্মকর্তা হিসেবে আমানতদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। কেউ আলেম হয়ে মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছে এবং জাতিকে পথনির্দেশ করছে। এসব সুমিষ্ট ফল একজন শিক্ষকের জন্য দুনিয়ায় রেখে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর কাজগুলোর অন্যতম। আর আখেরাতে তার জন্য রয়েছে বহুগুণ সওয়াব।
শিক্ষক হবেন উন্নত চরিত্রের অধিকারী এবং উদার স্বভাবের মানুষ। তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করবেন, তাদের প্রতি দয়া করবেন এবং ধৈর্য ধারণ করবেন। কোমলতা ও নম্রতাকে তিনি নিজের সঙ্গী করবেন। কারণ কোমলতা মানুষের হৃদয় খুলে দেয় এবং সব বিষয়কে সুন্দর করে তোলে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বিষয়ের মধ্যে কোমলতা থাকলে তা তাকে সুন্দর করে তোলে। আর কোনো বিষয় থেকে কোমলতা তুলে নেওয়া হলে তা তাকে অসুন্দর করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম)
হে শিক্ষকবৃন্দ! আপনি শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ। আপনার চরিত্র ও আচরণ তারা অনুসরণ করে। তাদের দৃষ্টি আপনার দিকে নিবদ্ধ থাকে। অনেক সময় আপনার কথার চেয়ে আপনার কাজ তাদের হৃদয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
হে শিক্ষার্থীরা! জ্ঞানের মূল্য উপলব্ধি করো। শিক্ষাজীবনের দিনগুলোকে কাজে লাগাও। জ্ঞানকে এমন একটি ভিত্তি বানাও, যার মাধ্যমে তুমি নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং চরিত্রকে সুন্দর করবে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অফুরন্ত উৎস থেকে আহরণ করো। নিজের দ্বীন নিয়ে গর্বিত থাকো। নিজের পরিচয় ও স্বকীয়তার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হও। চরিত্রে হও উন্নত এবং নীতিতে হও দৃঢ়।
জ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর ফলগুলোর একটি হলো, যখন সেটার প্রভাব জ্ঞানীর জীবনে প্রকাশ পায়। প্রকৃত শিক্ষার্থী সেই, যে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সেটার প্রভাব নিজের চরিত্র ও আচরণে প্রকাশ করে। শুধু মস্তিষ্ককে তথ্য দিয়ে পূর্ণ করলেই জ্ঞানের পূর্ণ প্রভাব অর্জিত হয় না, যদি তা সুন্দর চরিত্র ও উত্তম আচরণে প্রতিফলিত না হয়।
একজন শিক্ষার্থীর সুন্দর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সে তার শিক্ষকের মর্যাদা বুঝবে এবং তার সঙ্গে শিষ্টাচার বজায় রাখবে। কারণ শিক্ষককে সম্মান করা জ্ঞানকে সম্মান করারই অংশ এবং এটি উত্তম আদব।
৪ সেপ্টেস্বর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন
মুফতি আতিকুর রহমান