মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মায়ের কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলাম।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) আসরের নামাজের পর মিরপুরের গোলারটেক ঈদগাহ মাঠে তৃতীয় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন আমীরুল ইসলাম। চার দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা এবং বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে মরদেহ আনা হলে সহকর্মী ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বিকেল ৩টায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আমীরুল ইসলামের মরদেহ নেওয়া হয় বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে। সেখানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের নেতৃত্বে একাডেমির পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এক শোকবার্তায় অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘আমীরুল ইসলাম বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে এক সুপরিচিত নাম। তার ছড়া শিশুকিশোর-মনে আনন্দপ্রবাহ বিস্তারের পাশাপাশি দেশপ্রেম, সামাজিক সংহতি ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি সুদীর্ঘকাল দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে সাংস্কৃতিক বিকাশেও বিশেষ অবদান রেখেছেন।’
বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট বলেন, ‘আমীরুল ভাই আমাদের অভিভাবক ছিলেন। বাংলাদেশে বসন্ত উৎসব, বর্ষা উৎসব কিংবা নবান্ন উৎসবের মতো আয়োজনগুলোকে প্রচার ও সংস্কৃতির মূল ধারায় আনার পেছনে তার উদ্ভাবনী ধারণার বড় ভূমিকা ছিল।’
বিকালে বাংলা একাডেমি থেকে আমীরুল ইসলামের মরদেহ নেওয়া হয় বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। সেখানে ১৫ মিনিট মরদেহ রাখা হয় এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মায়ের কবরে তাকে দাফন করা হয়।
১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন আমীরুল ইসলাম। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি মূলত শিশুদের জন্যই ছড়া, গল্প ও সৃজনশীল রচনা লিখেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। এসব বইয়ের প্রায় সবই শিশুসাহিত্যভিত্তিক। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থাপনা-সদস্য ছিলেন।
শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া সাহিত্যচর্চায় অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
আমীরুল ইসলাম সবচেয়ে কম বয়সে খামখেয়ালি ছড়াগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার। এ ছাড়া তিনি সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৩), পদক্ষেপ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৫), ছোটদের পত্রিকা পুরস্কার (২০০৭), ছোটদের মেলা পুরস্কার (২০০৯-১০), জাতীয় ছড়া উৎসব সম্মাননা (২০১১) এবং শামসুর রাহমান সাহিত্য পুরস্কার (২০১১) লাভ করেন। ২০১১ সালে ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল পুনর্মিলনী সম্মাননাও পান তিনি। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে লাভ করেন অন্নদাশঙ্কর সাহিত্য পুরস্কার।
সাহিত্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমের সাথেও যুক্ত ছিলেন আমীরুল ইসলাম। আমৃত্যু চ্যানেল আইয়ে কর্মরত ছিলেন আমীরুল ইসলাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত কিশোর-তরুণদের উৎকর্ষধর্মী মাসিক ‘আসন্ন’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি প্রায় ১০ বছর। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার প্রথম চার রঙা কিশোর পাতা সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি ‘সাপ্তাহিক’-এর প্রকাশক ছিলেন।