চির ঘুমের দেশে শিশুসাহিত্যের স্পন্দন আমীরুল ইসলাম

আজকের সকালটা ভারী হয়ে ছিলো—শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম আর নেই। তিনি চলে গেলেন চির ঘুমের দেশে, স্থায়ী ঠিকানায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে, তার মায়ের কবরেই তাকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। যে মানুষটি সারাজীবন শিশুদের ঘুম ভাঙিয়েছেন গল্প দিয়ে, আজ তিনি নিজে ঘুমিয়ে গেলেন— যে ঘুম আর ভাঙে না।চির ঘুমের দেশে শিশুসাহিত্যের স্পন্দন আমীরুল ইসলাম

তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো আত্মার। চ্যানেল আই-এ অনুষ্ঠান বিভাগে একসাথে দীর্ঘদিন কাজ করেছি— দীর্ঘদিন মানে ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, দীর্ঘদিন মানে কতগুলো ভোর, কতগুলো গভীর রাতের এডিট প্যানেল, কতগুলো শিশুর হাসি ফ্রেমে বন্দি করা।

তিনি ছিলেন অন্যরকম মানুষ। তাঁর চেয়ার ছিলো বড়ো, গলা স্বর ছিল নরম— তুলোর মতো। তিনি আদেশ করতেন না, তিনি আবদার করতেন— ভালোবাসার আবদার। তিনি সবসময়ই আমাকে তুই বলেই সম্বোধন করতেন।

ভুল হলে তিনি রক্তচক্ষু দেখাতেন না, বলতেন— এই জায়গাটা আরেকটু ছুঁয়ে দেখতো, আরেকটু মাথা খাটা। তাঁর শাসনেও আদর ছিলো।

একটা দীর্ঘসময় তার বিচরণের এলাকাগুলোতে বেশিরভাগ সময় আমি সঙ্গী ছিলাম। এটা আমার অহংকার নয়, এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

তাঁর মানচিত্র ছিল বিস্তৃত। ঢাকার লালবাগ— যেখানে তার শেকড়, যেখানে কেল্লার ইটের পাশে তার শৈশবের ঘুড়ি উড়ত, সেই গলি থেকে মিরপুর গোলারটেক— তার নিজের বাসা। হ্যাঁ, ভাড়া নয়— নিজেদের বাড়ি। নিজের ইট, নিজের দেয়াল, নিজের বারান্দা। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের জন্য ঘর খুঁজেছেন— শিশুদের জন্য, বইয়ের জন্য। তিনি নিজের হাতে একটি ঘর বানিয়েছিলেন। সেই ঘরের বারান্দায় তুলসী, দেয়ালে শিশুদের আঁকা ছবি, চৌকিতে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি, আর অতিথির জন্য রাখা একটি বাড়তি চেয়ার। সেই চেয়ারে আমি কতবার বসেছি। তিনি হাঁটতেন, আমি হাঁটতাম। লালবাগের গলি থেকে গোলারটেকের উঠোন— সবখানে আমি তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলাম।

কর্মক্ষেত্র সে তো এক মহা-পরিক্রমা!

চ্যানেল আই— আমাদের ঘর। যেখানে তার হাত ধরে শিখেছি— অনুষ্ঠান মানে ক্যামেরা নয়, অনুষ্ঠান মানে মমতা। শুটিং ফ্লোরে তিনি দাঁড়াতেন সবচেয়ে পেছনে, সব আলো ফেলে দিতেন সামনের শিশুদের মুখে। শিশু না হাসলে তিনি বলতেন— কাট। ওর মনটা আগে হাসা।

বাংলা একাডেমি— ফেব্রুয়ারি এলেই তিনি হারিয়ে যেতেন একাডেমির চত্বরে। নজরুল মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে চা হাতে বলতেন— বইমেলা মানে বই বেচা নয়, বইমেলা মানে মানুষের সাথে মানুষের দেখা।

শিশু একাডেমি— এটি ছিল তার আরেকটি সংসার। দেয়ালে এখনো তার আঙুলের ছাপ লেগে আছে। শিশুরা আঁকতো, তিনি কখনো ঝুঁকে বলতেন— তোমার সূর্যটা তো হাসছে!

বইমেলা— সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ধুলোয় তার পায়ের ছাপ আজও আছে। প্রতি বছর একটি ছোট কাঁধ-ব্যাগ, ব্যাগে নতুন আর পুরনো স্মৃতি নিয়ে তিনি আসতেন।

পদক্ষেপ বাংলাদেশ— যেখানে তিনি স্বপ্ন দেখতেন প্রান্তিক শিশুও বই পাবে। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই যুক্ত ছিলেন— আমার স্বপ্ন ফেরি করা, শিক্ষা-শিল্প- সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মানবিক সংগঠন পদক্ষেপ বাংলাদেশ-এর সাথে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র— আলোর বৃত্তে বসে তিনি বলতেন— আলোকিত মানুষ চাই।

সাহিত্য আড্ডা— চায়ের কাপে, তর্কে, নীরবতায়— তিনি ছিলেন সকলের মধ্যমণি হয়ে। এছাড়াও এক কোণে বসা মানুষ হয়েও, কখনো সখনো ছিলেন দর্শকের ভূমিকায়।

আর কলকাতা— ওপার বাংলা। কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের গন্ধ, কফি হাউসের ধোঁয়া— সেখানেও তার অবাধ যাতায়াত। পাসপোর্টের ভিসা নয়, ভালোবাসার ভিসা নিয়ে যেতেন।

আমার এতো এতো স্মৃতি, এতো এতে সম্পর্ক— ভুলি কেমনে?

ভুলব কীভাবে সেই সন্ধ্যাগুলো— কাজ শেষে কখনো গোলারটেকের তাঁর বাসায় গিয়েছি। তিনি দরজা খুলে বলেছেন— কী রে, খেয়ে এসেছিস? আয়, ভাত খা। ভাতের সাথে ডাল, ডালের সাথে গল্প। তিনি বলতেন— জানিস, আজ একটা শিশু আমাকে জিজ্ঞেস করেছে— আপনি মরে গেলে আপনার গল্প কে লিখবে? আমি বলেছি— তুই লিখবি। আজ আমি লিখছি। কাঁপা হাতে আপনার গল্প লিখছি।

আজ আপনাকে শুইয়ে দেওয়া হলো শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে— আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী মায়ের কবরেই। কী অদ্ভুত, কী কাব্যিক সমাপ্তি! সারাজীবন যিনি মায়েদের গল্প শুনিয়েছেন, আজ তিনি নিজে মায়ের কোলে ফিরে গেলেন। মাটির মা তাকে ডেকে নিলেন— আয়, খোকা, এবার ঘুমা।

উপরে আকাশ, নিচে দুটি কবর— একটি পুরনো, একটি নতুন। নতুন কবরের মাটি এখনো ভেজা, ভেজা মাটির গন্ধে এখনো লেগে আছে— বইমেলার ধুলো, চ্যানেল আই-এর আলো, শিশু একাডেমির রঙ। যদি কান পাতেন, শুনবেন— তিনি এখনো ফিসফিস করে মাকে গল্প বলছেন— মা, জানো, লালবাগের একটা ছেলে আজও আমার বই পড়ে, গোলারটেকের বারান্দায় তুলসীটা আজও আছে।

শিশুসাহিত্যিকরা মরে না, তারা রূপকথা হয়ে যায়।

আমীরুল ইসলাম, আপনি এখন রূপকথা। আপনি এখন লালবাগের গলিতে ঘুড়ি, গোলারটেকের নিজের ঘরে জ্বলে থাকা একটি হারিকেন। চ্যানেল আই-এর আর্কাইভে একটি পুরনো ফিতা, বাংলা একাডেমির চত্বরে একটি খালি চেয়ার। শিশু একাডেমির দেয়ালে একটি হাসিমুখ সূর্য। আর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা এক শিশু।

আপনি ঘুমান। চির ঘুমের দেশে, মায়ের পাশে, স্থায়ী ঠিকানায় ভালো থাকবেন। আমরা জেগে থাকব— আপনার রেখে যাওয়া অক্ষরগুলো বুকে নিয়ে।

আর আপনার আমার স্বপ্ন ফেরি করা সংগঠন পদক্ষেপ বাংলাদেশ অসমাপ্ত কাজগুলো করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবে...

নিশ্চয়ই আপনাকে নিয়ে বৃহৎ কলেবরে লিখবো—আর তা হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটা অধ্যায়।যেখানেই আছেন, সেখানেই আনন্দ আড্ডার ফোয়ারা নিয়ে একদিন আসবো। ততোদিন ভালো থাকুন আমীরুল ইসলাম, বস।