তালাকপ্রাপ্ত নারীর নিরাপদ আশ্রয় কোথায়?

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ পিএম

তালাকপ্রাপ্ত নারীর আবাসনের অধিকার: পারিবারিক আইনে নতুন ভাবনার সময় এসেছে। একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীর ঠিকানা কোথায়?

প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সামাজিক মনে হলেও বাস্তবে এটি আইন, অর্থনীতি, মানবিক মর্যাদা, নারী অধিকার এবং শিশুর কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের সমাজে বিয়ের পর একজন নারীকে প্রায়ই বলা হয়- ‘এখন স্বামীর বাড়িই তোমার বাড়ি।’ কিন্তু কোনো কারণে দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘটলে সেই বাড়িটিই মুহূর্তের মধ্যে তার জন্য অনিরাপদ কিংবা অপ্রবেশযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

আবার বাবার বাড়িতে ফিরে গেলে অনেক নারীকে সামাজিকভাবে এমন অনুভব করানো হয়, যেন বিয়ের মাধ্যমে তিনি সেই বাড়ির ওপর তার স্বাভাবিক অবস্থান হারিয়েছেন।

ফলে একজন নারী কখনো কখনো দুটি বাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন- একটি বাড়ি, যেটি তিনি দাম্পত্যের সঙ্গে হারিয়েছেন; আরেকটি বাড়ি, যেখানে ফিরে যাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও সামাজিকভাবে তাকে বোঝা মনে করা হয়।

প্রশ্ন হলো- বিবাহবিচ্ছেদের মূল্য কি একজন নারীর নিরাপদ আশ্রয় হারানো হতে পারে?

সম্পত্তির মালিকানা আর আবাসন নিরাপত্তা এক নয়, এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি।

বিবাহের কারণে একজন নারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার স্বামীর সম্পত্তির মালিক হয়ে যান না। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা আইন দ্বারা সুরক্ষিত এবং বিবাহবিচ্ছেদের অজুহাতে কারও সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না।

কিন্তু সম্পত্তির মালিকানা এবং নিরাপদ আবাসনের সুরক্ষা এক বিষয় নয়।

একজন ব্যক্তি কোনো বাড়ির মালিক না হয়েও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেখানে বসবাসের আইনগত সুরক্ষা পেতে পারেন। বিশেষত যখন সেই ব্যক্তির অর্থনৈতিক দুর্বলতা, পারিবারিক নির্ভরশীলতা কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কল্যাণের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশের পারিবারিক আইন মূলত দেনমোহর, ভরণপোষণ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্বের মতো বিষয়গুলোতে প্রতিকার প্রদান করে। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদের পর একজন নারী ও তার সন্তান কোথায় এবং কীভাবে নিরাপদে বসবাস করবেন—এই প্রশ্নটি একটি স্বতন্ত্র আইনগত ও নীতিগত আলোচনার দাবি রাখে।

শুধু ভরণপোষণের একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না।

বাসাভাড়া কত? নিরাপদ বাসা পাওয়া সম্ভব কি না? সন্তানের স্কুল ও চিকিৎসার ব্যবস্থা কোথায়? মায়ের কর্মস্থলের সঙ্গে বাসস্থানের দূরত্ব কত?

এই বাস্তব প্রশ্নগুলোও বিবাহবিচ্ছেদ-পরবর্তী জীবনের অংশ।

ভরণপোষণের ধারণাকে কেবল খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে একজন নারী ও শিশুর বাস্তব জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বিবেচনা করা হয় না। নিরাপদ বাসস্থান মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান উপাদান। বিশেষ করে একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের প্রধান পরিচর্যাকারী হন, তাহলে তার আবাসন নিরাপত্তা সরাসরি সন্তানের জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং, ভরণপোষণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাসাভাড়া ও যুক্তিসঙ্গত আবাসন ব্যয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি অবশ্যই ভিন্ন হবে। স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য, স্ত্রীর নিজস্ব আয়, সন্তানের সংখ্যা, জীবনযাত্রার মান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

কিন্তু আবাসনের প্রশ্নটিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা যাবে না।

শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের সঙ্গে নিরাপদ বাসস্থানের সম্পর্ক

বাংলাদেশের আদালত বিভিন্ন হেফাজতসংক্রান্ত মামলায় শিশুর কল্যাণ ও সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

এরিকো নাকানো বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য, ১৬ এসসিওবি [২০২২] এডি ১০৭ মামলায় আপিল বিভাগ পুনর্ব্যক্ত করেন যে, শিশুর কল্যাণকে ব্যাপক অর্থে বিবেচনা করতে হবে এবং কোনো অভিভাবকের আইনগত অধিকার শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না।

শিশুর কল্যাণ কেবল খাবার বা স্কুলের খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর প্রয়োজন—

একটি নিরাপদ ঘর;
একটি স্থিতিশীল পরিবেশ;
শিক্ষার ধারাবাহিকতা;
মানসিক নিরাপত্তা; এবং
নিয়মিত পরিচর্যা।

যদি যে অভিভাবক শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা করছেন, তার নিজেরই নিরাপদ বাসস্থান না থাকে, তাহলে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ কীভাবে নিশ্চিত হবে?

এই বাস্তবতা বিবাহবিচ্ছেদ-পরবর্তী আবাসন প্রশ্নকে কেবল নারীর ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং শিশুর কল্যাণের প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।

বাবার বাড়ি কি একজন নারীর নিজের বাড়ি নয়?

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। বিয়ের আগে মেয়ের বাড়ি বাবার বাড়ি। বিয়ের পরে স্বামীর বাড়ি তার বাড়ি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন নারীর নিজের বাড়ি কোথায়?

বিয়ে একজন নারীর কন্যা হিসেবে পরিচয় বিলুপ্ত করে না।

একজন নারী তার পিতামাতার বৈধ উত্তরাধিকারী হলে, তার উত্তরাধিকার বা মালিকানাসংক্রান্ত অধিকার বিয়ের কারণে বিলুপ্ত হওয়ার কথা নয়। বিবাহ একটি নারীর পারিবারিক পরিচয় পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু তার নাগরিকত্ব, ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা কিংবা আইনগত অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।

আমাদের সামাজিক চিন্তাভাবনায় তাই একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। একজন নারীর নিরাপদ আশ্রয়কে কেবল তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে দেখা যাবে না। একজন নারীকে শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই রক্ষার জন্য একটি অসুখী, সহিংস বা অসম্মানজনক দাম্পত্য সম্পর্কে থাকতে বাধ্য করা উচিত নয়।

সংবিধানের আলোকে তালাকপ্রাপ্ত নারীর মর্যাদা

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ২৮(১) অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমঅধিকার থাকবে।

এই সাংবিধানিক নীতিগুলো কেবল একটি আদর্শিক ঘোষণা নয়। আইন প্রণয়ন, আইন সংস্কার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

একজন নারী তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে কম মর্যাদার নাগরিক হয়ে যান না। তার বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। কিন্তু তার সাংবিধানিক মর্যাদার কোনো পরিবর্তন হয় না।

পারিবারিক আদালতের ভূমিকা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন

পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় নারী ও শিশুর জন্য নতুন ধরনের সংকট তৈরি করে।

বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ কিংবা সন্তানের হেফাজতসংক্রান্ত মামলা বছরের পর বছর চললে একজন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারী বাস্তব জীবনে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।

তাই উপযুক্ত ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালতের এমন কার্যকর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় নারী ও শিশুর জরুরি প্রয়োজন বিবেচনা করা সম্ভব হবে।

এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচনায় আসতে পারে—

যুক্তিসঙ্গত বাসাভাড়া বা আবাসন ব্যয়;
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আবাসন প্রয়োজন;
আকস্মিক উচ্ছেদ বা গৃহহীনতার ঝুঁকি;
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা;
অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নির্ভরশীলতার অবস্থা।

অবশ্যই প্রতিটি ক্ষেত্রে আদালতকে প্রমাণ, আর্থিক সামর্থ্য এবং মামলার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশে প্রয়োজন বিবাহবিচ্ছেদ-পরবর্তী আবাসন সুরক্ষা কাঠামো

বাংলাদেশের আইন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন বিবাহবিচ্ছেদ-পরবর্তী আবাসন সুরক্ষা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন।

একটি সম্ভাব্য বিবাহবিচ্ছেদ-পরবর্তী আবাসন সুরক্ষা কাঠামোতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—

১. আবাসন ব্যয়কে ভরণপোষণের অংশ হিসেবে বিবেচনা

উপযুক্ত ক্ষেত্রে নারী ও সন্তানের বাসাভাড়া এবং যুক্তিসঙ্গত আবাসন ব্যয় ভরণপোষণ নির্ধারণের সময় বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

২. জরুরি অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা

বিবাহবিচ্ছেদ বা পারিবারিক বিরোধের কারণে কোনো নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান হঠাৎ গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়লে দ্রুত অন্তর্বর্তী প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

৩. শিশুকেন্দ্রিক আবাসন বিবেচনা

যেসব ক্ষেত্রে সন্তান মায়ের দৈনন্দিন তত্ত্বাবধানে রয়েছে, সেখানে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থিতিশীল জীবন নিশ্চিত করার জন্য আবাসন নিরা…

৪. অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল নারীদের জন্য বিশেষ সহায়তা

সরকারি ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও অসহায় তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য অস্থায়ী আবাসন বা ভাড়াসহায়তার ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

৫. অস্থায়ী নিরাপদ আবাসন

বিশেষত যেসব নারী পারিবারিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক নির্যাতন অথবা আকস্মিক গৃহহীনতার শিকার হন, তাদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অস্থায়ী নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৬. দ্রুত বিচার ও কার্যকর প্রতিকার

পারিবারিক বিরোধে জরুরি আর্থিক ও আবাসনসংক্রান্ত প্রশ্ন দ্রুত বিবেচনার জন্য কার্যকর বিচারিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এটি পুরুষের সম্পত্তির বিরুদ্ধে কোনো দাবি নয়

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তালাকপ্রাপ্ত নারীর আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা মানেই পুরুষের সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়ার দাবি নয়।

কেউ শুধু বিবাহিত ছিলেন বলেই অন্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবেন—এমন কোনো নীতির কথাও বলা হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—বিবাহবিচ্ছেদের পর একজন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারী ও তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে কীভাবে আকস্মিক গৃহহীনতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া যায়?

আইনের কাজ এক পক্ষের অধিকার কেড়ে অন্য পক্ষকে দেওয়া নয়। আইনের কাজ হলো বিভিন্ন অধিকার ও বাস্তবতার মধ্যে ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য সৃষ্টি করা।

এখানে ভারসাম্য প্রয়োজন—সম্পত্তির অধিকার, নারীর সমতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিশুর কল্যাণ এবং মানবিক মর্যাদার মধ্যে।

এটি কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়। এটি ন্যায়বিচারের দাবি।

আইন সংস্কারের আলোচনা এখনই শুরু হওয়া উচিত

বাংলাদেশে নারীর অধিকার নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, ভরণপোষণ এবং পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার—সব ক্ষেত্রেই আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদের পর একজন নারীর বাস্তব জীবনের আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে একটি সমন্বিত আইনগত ও নীতিগত আলোচনা এখনও প্রয়োজন।

আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার, আইন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইনজীবী, নারী অধিকারকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি জাতীয় আলোচনা হতে পারে।

প্রয়োজনে গবেষণা করে দেখা যেতে পারে—

কতজন তালাকপ্রাপ্ত নারী আবাসন সংকটে পড়েন? তাদের মধ্যে কতজন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের দায়িত্ব পালন করেন? বর্তমান ভরণপোষণ ব্যবস্থা তাদের আবাসন ব্যয় মেটাতে কতটা কার্যকর? কোন ধরনের অন্তর্বর্তী আইনগত প্রতিকার বাস্তবসম্মত হতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব।

বিবাহবিচ্ছেদ হোক দাম্পত্যের, নারীর নিরাপত্তার নয়। একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী এখনও একজন নাগরিক।

তিনি একজন মা হতে পারেন। তিনি একজন কন্যা। তিনি একজন পেশাজীবী। তিনি একজন উপার্জনকারী। তিনি পরিবারের প্রধান পরিচর্যাকারীও হতে পারেন।

একটি দাম্পত্য সম্পর্কের সমাপ্তি তার ব্যক্তিত্বের সমাপ্তি নয়।

স্বামীকে হারানোর কারণে তার নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কথা নয়। একটি বিবাহ ভেঙে যাওয়ার কারণে তার মর্যাদা হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়।

তাই আমাদের প্রশ্নটি হয়তো পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—‘তালাকপ্রাপ্ত নারী কার বাড়িতে থাকবেন?’

বরং আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—

‘একজন নারীর নিরাপদ আবাসনের অধিকার কেন তার বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে?’

বাংলাদেশের পারিবারিক আইনকে সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

কারণ ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়। ন্যায়বিচার মানুষের বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হতে হয়।

একজন নারী যদি আইনি বিচ্ছেদ পান, কিন্তু সেই বিচ্ছেদের ফলে তিনি ও তার সন্তান অনিশ্চিত আশ্রয়ের মুখে পড়েন, তাহলে আমাদের আইন ও নীতির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিবাহবিচ্ছেদ একটি দাম্পত্য সম্পর্কের সমাপ্তি হতে পারে—কিন্তু তা কখনোই একজন নারীর নিরাপদ, স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের সমাপ্তি হওয়া উচিত নয়।

বিচ্ছেদ হোক দাম্পত্যের।
নিরাপত্তার নয়।
মর্যাদার নয়।
একজন নারীর ‘ঘর পাওয়ার অধিকারের নয়।

লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত