সুন্দরবনসংলগ্ন নদীর তলদেশে লুণ্ঠন

নদীর দিকে তাকালে আমরা সাধারণত পানি দেখি। দেখি জোয়ার-ভাটা, নৌকা, জেলেদের ব্যস্ততা আর নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবন। কিন্তু পানির নিচে, নদীর তলদেশে যে আরেকটি জগৎ আছে সেটি নিয়ে আমরা খুব কম ভাবি। সেখানে আছে নানা ধরনের ছোট ছোট প্রাণী, কাদা, পলি, জলজ উদ্ভিদ ও অণুজীব। সবকিছু মিলে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়। শামুকও সেই পরিবেশের একটি অংশ। শামুক দেখতে ছোট। বাজারে এর দাম খুব বেশি নয়। কিন্তু প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীর গুরুত্ব, আকার বা বাজারদর দিয়ে বিচার করা যায় না। নদীর তলদেশ থেকে যখন প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে নেওয়া হয়, তখন বিষয়টি শুধু কয়েকজন মানুষের আয়-রোজগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে।

খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে ব্যাপকভাবে শামুক আহরণের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও মানুষ শামুক তুলছেন। আবার কোথাও যন্ত্র ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে শামুক তোলা হচ্ছে। যন্ত্র দিয়ে আহরণের বিষয়টি বেশি উদ্বেগের। কারণ এতে অল্প সময়ে অনেক শামুক তুলে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে নদীর তলদেশের কাদা ও পলি উঠে আসার আশঙ্কা থাকে। কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের মদিনাবাদ ও গোবরা এলাকায়, যন্ত্রের সাহায্যে শামুক আহরণের ঘটনা চোখে পড়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি বোটে বিপুল পরিমাণ শামুক সংগ্রহ করা যায়। পরে এসব শামুক ট্রাকে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। শুধু দিনের বেলা নয়, রাতেও নদীতে শামুক তোলার অভিযোগ রয়েছে। এখানেই আসল প্রশ্ন, নদী থেকে এভাবে প্রতিদিন কত শামুক তুলে নেওয়া হচ্ছে তার কোনো হিসাব আছে? কোন নদীতে কত শামুক আছে, আগে কত ছিল, এখন কত আছে এসব তথ্যও আমাদের হাতে নেই। ফলে শামুকের সংখ্যা কমে গেলেও, আমরা হয়তো অনেক পরে বিষয়টি বুঝতে পারব। প্রকৃতির অনেক ক্ষতি এমন। শুরুতে দেখা যায় না। নদীতে পানি থাকবে, জোয়ার-ভাটা থাকবে, মাছ থাকবে। বাইরে থেকে মনে হবে, সব ঠিক আছে। কিন্তু নদীর তলদেশে ধীরে ধীরে একটি পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে। শামুককে আমরা অনেক সময় গুরুত্বহীন প্রাণী হিসেবে দেখি। অথচ শামুক ও অন্যান্য মলাস্ক জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে ৪৩ প্রজাতির মলাস্ক বা শামুক-ঝিনুকজাতীয় প্রাণীর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে।  নদীর তলদেশ থেকে কোনো প্রাণী ব্যাপকভাবে তুলে নেওয়ার আগে, চিন্তা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, যন্ত্র দিয়ে শামুক তোলার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা দরকার। হাতে কয়েকজন মানুষ যতটা শামুক তুলতে পারবেন, একটি যন্ত্র ব্যবহার করে তার চেয়ে অনেক বেশি সংগ্রহ করা সম্ভব। ফলে একই সময়ে নদীর একটি নির্দিষ্ট এলাকার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। নদীর তলদেশের কাদা-পলি উঠে এলে সেখানে থাকা অন্য ক্ষুদ্র প্রাণী বা তাদের আবাসস্থলের কী হয়, সেটি জানা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই অঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতির ওপর পড়ছে। এর মধ্যে নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে শামুক তুলে নেওয়া হলে সেটি নদীর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে কিনা, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। বন বিভাগের অভিযানে শামুক জব্দ করে, সুন্দরবনে অবমুক্ত করার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্বিচারে শামুক আহরণ বন্ধে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এসব উদ্যোগ অবশ্যই দরকার। কিন্তু শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শামুক আহরণের কারণে নদীর পরিবেশে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, নদীর তলদেশ থেকে শামুক তোলার বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা দরকার। যদি দেখা যায়, এই আহরণের কারণে নদীর তলদেশের পরিবেশ বা অন্য জলজ প্রাণীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তাহলে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তবে শামুক তোলার সঙ্গে মানুষের জীবিকা জড়িত থাকলে, সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে বিকল্প জীবিকার বিষয়ে ভাবতে হবে।

নদীকে শুধু অর্থ উপার্জনের জায়গা হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নদী একটি জীবন্ত পরিবেশ। সেখানে মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুকসহ অসংখ্য ছোট প্রাণী আছে। প্রত্যেকের কোনো না কোনো ভূমিকা রয়েছে। সুন্দরবনকে শুধু গাছের বন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে নদী, খাল, মোহনা, কাদাচর ও জোয়ার-ভাটার জলাভূমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে, জলপথের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। শামুকের প্রজাতি ও সংখ্যা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। কোথায় কতটা আহরণ হচ্ছে, তার হিসাব রাখতে হবে। যন্ত্র দিয়ে আহরণের বিষয়টি বিশেষভাবে নজরদারির মধ্যে থাকা দরকার। যদি কোথাও অবৈধভাবে আহরণ হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, নদীর তলদেশকে নতুন করে দেখতে হবে। এটি শুধু কাদা-পলির জায়গা নয়, জীবন্ত জগৎ। সেখানে থাকা ছোট্ট শামুকও, সেই জগতের অংশ।

লেখক : সংবাদকর্মী,  প্রধান সমন্বয়ক সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ